ব্রিকলেন নিউজ, প্রতিবেদক, ঢাকা:
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে হত্যা মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত হত্যা মামলা বেড়েছে ১২ দশমিক ২ শতাংশ। এ সময়ে সারা দেশে মোট ১ হাজার ৭৭৮টি হত্যা মামলা হয়েছে, যার প্রায় ৪৪ শতাংশই ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে হত্যা মামলা হয়েছিল ১ হাজার ৫৮৫টি। সেই হিসাবে চলতি বছরের একই সময়ে হত্যা মামলা বেড়েছে ১৯৩টি।
বিভাগভিত্তিক তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথমার্ধে সবচেয়ে বেশি ৪১১টি হত্যা মামলা হয়েছে ঢাকা বিভাগে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩৬৩টি মামলা হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে। এরপর রাজশাহী বিভাগে ১৮৩টি, খুলনায় ১৭৩টি, রংপুরে ১১০টি, সিলেটে ১০৮টি, ময়মনসিংহে ১০৫টি এবং বরিশাল বিভাগে ৯৬টি হত্যা মামলা হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, দখলদারত্ব, চাঁদাবাজি এবং স্থানীয় বিরোধকে কেন্দ্র করে সহিংসতা বেড়েছে। এর প্রভাবই হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার পরিবর্তনের পর বিভিন্ন এলাকায় নতুন গোষ্ঠী প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। এ প্রতিযোগিতার ফলে খুনসহ নানা ধরনের সহিংস অপরাধ বাড়ছে। তিনি বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ঘনত্ব বেশি হওয়ায় এসব এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অপরাধের প্রবণতাও তুলনামূলক বেশি।
তিনি আরও বলেন, অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা না গেলে দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়। তাই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও বিচার বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডও এ প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত জুনে চট্টগ্রামের রাউজানে প্রকাশ্যে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় পুলিশের তালিকাভুক্ত অপরাধী রায়হানকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি স্থানীয় সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কও এ ঘটনায় ভূমিকা রেখেছে।
এ ছাড়া ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে আকাশ দাস নামে এক যুবককে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। র্যাবের তদন্তে উঠে আসে, স্থানীয় সন্ত্রাসী চক্রের চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় তাকে হত্যা করা হয়েছিল।
চট্টগ্রামে চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনাও বেড়েছে। সর্বশেষ ২০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে এক ব্যবসায়ীর নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবনে হামলা ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এর আগে নগরের একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন মনে করেন, সাম্প্রতিক অনেক সহিংস ঘটনার পেছনে আধিপত্যের লড়াই, রাজনৈতিক বিরোধ এবং ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব কাজ করছে। তার ভাষ্য, এখনো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতির ওপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চা, জবাবদিহি এবং নৈতিকতার সংস্কৃতি জোরদারের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে হত্যার মতো সহিংস অপরাধ কমানো সম্ভব।
তবে পুলিশ বলছে, হত্যাসহ সব ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, সামাজিক, পারিবারিক, ব্যক্তিগত, অর্থনৈতিক এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক বিরোধের কারণে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়ে থাকে। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছে।
তিনি জানান, খুনসহ সব ধরনের অপরাধ দমনে মাঠ পর্যায়ে টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ পেশাদারত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে।