ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে অনিয়মিত অভিবাসী বিনিময় নিয়ে করা ‘ওয়ান ইন ওয়ান আউট’ চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া এই চুক্তি আর নবায়ন না করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে যুক্তরাজ্য সরকার।
চুক্তির আওতায় ছোট নৌকায় করে ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানো অনিয়মিত অভিবাসীদের ফ্রান্সে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা ছিল। এর বিনিময়ে ফ্রান্সে অবস্থানরত কিছু অভিবাসীকে বৈধ পথে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা ছিল।
৩০ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চুক্তিটি আর নবায়ন করা হচ্ছে না এবং এর আওতায় নতুন কোনো মামলা প্রক্রিয়াধীন নেওয়া হচ্ছে না। চুক্তিটির মেয়াদ ১ অক্টোবর শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে আগামী কয়েক সপ্তাহেও কিছু ফেরত পাঠানোর ফ্লাইট পরিচালিত হবে বলে জানিয়েছে লন্ডন।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, চুক্তিটি কীভাবে শেষ করা হবে, সে বিষয়ে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
চুক্তিটির অন্যতম লক্ষ্য ছিল ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে যুক্তরাজ্যে অনিয়মিতভাবে প্রবেশ নিরুৎসাহিত করা। তবে প্রত্যাশিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি এই কর্মসূচি। যুক্তরাজ্য সরকারের একটি সূত্র এএফপিকে জানিয়েছে, চুক্তিটি কিছু সাফল্য অর্জন করলেও প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি।
এই কর্মসূচির আওতায় ফ্রান্স থেকে ২ হাজার ৬০০ জনকে বৈধভাবে যুক্তরাজ্যে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় অনিয়মিতভাবে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানো প্রায় ১ হাজার ৫০০ অভিবাসীকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হয়েছে। একই সময়ে ফ্রান্সে অবস্থানরত প্রায় ১ হাজার ৫০০ জনকে বৈধভাবে যুক্তরাজ্যে নেওয়া হয়েছে।
২০২৬ সালের ২৩ এপ্রিল ফ্রান্স সফরের সময় ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদ ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী লরো নুনেজের সঙ্গে তিন বছরের ৬৬ কোটি ২০ লাখ পাউন্ডের একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। এর আগে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এই চুক্তিকে ‘বিপ্লবী’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছিলেন, চুক্তিটির লক্ষ্য ছিল মানব পাচারকারীদের ব্যবসায়িক মডেল এবং ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পারাপারের ওপর শক্তিশালী নিরুৎসাহমূলক প্রভাব তৈরি করা।
তবে চুক্তিটি চালু রাখার বিষয়ে ফ্রান্সের অবস্থানও ইতিবাচক ছিল না। গত ১৫ জুন ফ্রান্সের জাতীয় পরিষদের একটি তদন্ত কমিটির শুনানিতে ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী লরো নুনেজ বলেছিলেন, এই পরীক্ষামূলক চুক্তি ১ অক্টোবরের পর চালু রাখার উদ্দেশ্যে করা হয়নি। তার মতে, ফ্রান্সের একা এই ব্যবস্থা বহন করা উচিত নয়; বরং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে বৃহত্তর কোনো চুক্তির অংশ হিসেবে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে চুক্তির আওতায় তুলনামূলকভাবে কমসংখ্যক অভিবাসী ফেরত পাঠানোর বিষয়টি স্বীকার করেছিলেন ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদ। তিনি জানিয়েছিলেন, প্রতি সপ্তাহে বিপুলসংখ্যক বহিষ্কার কার্যক্রম পরিচালনা করাই ছিল সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলোর একটি।
চুক্তিটি শুরু থেকেই মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার মুখে পড়ে। তাদের অভিযোগ ছিল, এই ব্যবস্থা শরণার্থীদের অধিকারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ‘মেদসাঁ সঁ ফ্রন্তিয়ের’ জানিয়েছে, কর্মসূচিটির কারণে শত শত নির্বাসিত মানুষের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে। সংগঠনটি ফ্রান্সের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি আর না করার আহ্বান জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, নিজ দেশে নিপীড়নের কারণে পালিয়ে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আবেদন করার সুযোগ থেকে বিরত রাখা বেআইনি। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স উভয়ই জেনেভা কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী দেশ।
ইনফোমাইগ্র্যান্টসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের আবেদন করা শীর্ষ ১০টি দেশের নাগরিকদের ৭২ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৫৬ শতাংশকে শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরু থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছোট নৌকায় করে ১৯ হাজার ১৯৬ জন যুক্তরাজ্যে পৌঁছেছেন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি কম।
তবে ইংলিশ চ্যানেলে অনিয়মিত পারাপারের ঝুঁকি অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছর ছোট নৌকায় চ্যানেল পার হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে এক শিশুসহ তিনজনের মৃত্যুর ঘটনাও রয়েছে। তদন্ত কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এই এলাকায় ৩১ জন এবং ২০২৪ সালে ৭৮ জন প্রাণ হারান।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা বাড়ার কারণে কেউ কেউ আরও ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছেন। বেলজিয়াম থেকে যাত্রা শুরু করে ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে। এতে পারাপারের সময় আরও বেড়েছে এবং ছোট নৌকায় আগের তুলনায় বেশি মানুষ ওঠার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।