লন্ডন/ঢাকা: মধ্যপ্রাচ্য সংকট আবারও নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জেরে ইরানে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই আকস্মিক উত্তেজনার প্রভাবে বুধবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম একলাফে ২ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই সংঘাত এমন এক সময়ে ঘটল যখন দুই দেশ সংকট নিরসন এবং নৌপথটি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার জন্য শান্তি আলোচনার কথা ভাবছিল। সংঘাতের কারণে সেই সম্ভাবনা এখন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে, ভূ-রাজনৈতিক এই অস্থিরতা ও প্রযুক্তি (টেক) খাতের শেয়ারে ব্যাপক দরপতনের কারণে বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারেও এক ধরনের হতাশা ও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।
মার্কিন হামলা ও ইরানের হুঁশিয়ারি ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজে হামলার জবাবেই ইরানের ওপর এই ‘শক্তিশালী’ হামলা চালানো হয়েছে। সেন্টকম সতর্ক করে বলেছে, “বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জন্য ইরানকে চরম মূল্য দিতে হবে।”
জানা গেছে, ওমানের উপকূলের কাছে তিনটি জাহাজে এই হামলার ঘটনা ঘটে। ওমান এর আগে নিজেদের উপকূল ঘেঁষে একটি অস্থায়ী ট্রানজিট করিডর বা বিকল্প নৌপথ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু তেহরান এই উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে, কারণ তারা হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর ওপর নিজস্ব ফি বা টোল আরোপ করতে চায়।
এই ঘটনার পরপরই ওয়াশিংটন ইরানের তেল বিক্রির ওপর দেওয়া একটি অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা ছাড় (Sanctions waiver) বাতিল করে দেয়। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র বারবার দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন করছে। নিজেদের স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় ‘চূড়ান্ত ও কঠোর পদক্ষেপ’ নেওয়ারও হুমকি দিয়েছে তেহরান।
তেলের বাজার ও হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব হরমুজ প্রণালি বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের একটি বিশাল অংশের ট্রানজিট রুট। এই উত্তেজনার জেরে বুধবার বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড এবং ইউএস ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই)—উভয় অপরিশোধিত তেলের দামই ২ শতাংশের বেশি বেড়ে গত দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগের দিন মঙ্গলবারও তেলের দাম প্রায় সমপরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, “প্রণালিটি ব্যবহারের জন্য ফি আদায়ের দাবিতে ইরান অনড়, যা ওয়াশিংটন কোনোভাবেই মানতে রাজি নয়।” তিনি আরও বলেন, “আমরা এখন এমন একটি স্পর্শকাতর সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে বিকল্প কোনো নৌপথ খোঁজার চেষ্টা চলছে। তবে ইরান একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, তারা এ ধরনের কোনো বিকল্প ব্যবস্থাই মেনে নেবে না।”
শেয়ারবাজারে পতন: এআই বনাম ভূ-রাজনীতি মার্কিন-ইরান এই নতুন উত্তেজনার প্রভাব শুধু তেলের বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, আছড়ে পড়েছে শেয়ারবাজারেও। গত দুই বছর ধরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের ওপর ভর করে শেয়ারবাজারগুলো রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছালেও, এখন সেই বিনিয়োগের মুনাফা ফেরা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। ফলে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারগুলোতে ব্যাপক দরপতন শুরু হয়েছে।
এশিয়ার বাজারে একসময় ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার নেতৃত্ব দেওয়া দক্ষিণ কোরিয়ার ‘কসপি’ (Kospi) সূচক বুধবার ১ শতাংশের বেশি কমেছে। গত মাসে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর পর থেকে সূচকটি ইতোমধ্যে ২০ শতাংশের বেশি মান হারিয়েছে। এআই চিপের তীব্র চাহিদার কারণে দ্বিতীয় প্রান্তিকে নিজেদের পরিচালন মুনাফা ১,৮০০ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া সত্ত্বেও মঙ্গলবার স্যামসাং-এর শেয়ারে বড় ধরনের ধস নামে।
টোকিও, সাংহাই, সিডনি, সিঙ্গাপুর, ওয়েলিংটন এবং তাইপের শেয়ারবাজারেও পতন দেখা গেছে। তবে এর বিপরীতে হংকংয়ের শেয়ারবাজার ১ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
এটি গ্লোবাল মার্কেটস-এর বিশ্লেষক নিক টুইডেল বলেন, “গত কয়েক সপ্তাহ ধরে শেয়ারবাজারে কেবল এআই এবং প্রযুক্তি খাতের সেন্টিমেন্ট আধিপত্য বিস্তার করছিল। কিন্তু এখন বিনিয়োগকারীরা বাধ্য হয়েই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার দিকে নজর ফেরাচ্ছেন। আগামী দিনগুলোতে সংঘাত আরও বাড়লে বাজারের গতিপ্রকৃতি এই ভূ-রাজনীতিই নিয়ন্ত্রণ করবে।”
ডলারের দাম ও মূল্যস্ফীতির শঙ্কা মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহে নতুন করে বিঘ্ন ঘটার এই শঙ্কায় বিশ্বের অন্যান্য প্রধান মুদ্রার বিপরীতে মার্কিন ডলারের দাম বেড়েছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, তেলের দাম বাড়লে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য চড়া থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (Fed) বাধ্য হয়েই সুদের হার আরও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।