Skip to main content

Brick Lane News

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা: আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায় কাল

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা: আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায় কাল

ঢাকা: সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা আপিলগুলোর চূড়ান্ত রায় আগামীকাল বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ঘোষণা করবেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এই সংশোধনীর মাধ্যমেই মূলত দেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এনে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল।

প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ বুধবার (৮ জুলাই) টানা তিন দিনের শুনানি শেষে রায়ের এই দিন ধার্য করেন।

আপিলকারী ও আইনি লড়াই পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে মোট তিনটি পৃথক আপিল এবং একটি লিভ-টু-আপিল দায়ের করা হয়েছিল।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ চার বিশিষ্ট নাগরিক প্রথম আপিলটি করেন। দ্বিতীয় আপিলটি করেন নওগাঁর বাসিন্দা মো. মোফাজ্জল হোসেন এবং তৃতীয় আপিলটি দায়ের করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এর পাশাপাশি হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) নামের একটি মানবাধিকার সংগঠনের লিভ-টু-আপিলও শুনানির কার্যতালিকায় ছিল।

গত ২৩ জুনের আদেশ অনুযায়ী, সোমবার (৬ জুলাই) থেকে আপিলগুলোর ওপর নতুন করে শুনানি শুরু হয় এবং বুধবার তা শেষ হয়। সুজন সম্পাদকসহ চারজনের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির এবং এইচআরএসএসের পক্ষে ইমরান এ সিদ্দিক আইনি যুক্তি তুলে ধরেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুল্লাহ আল মাসুদ।

প্রেক্ষাপট ও হাইকোর্টের রায় ২০১১ সালের ৩০ জুন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী আনে, যার মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ ৫৪টি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, এই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে দুটি পৃথক রিট দায়ের করা হয়। চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত বছরের (২০২৫ সালের) ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ নম্বর ধারা (যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট বাতিল করা হয়েছিল) বাতিল ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে সংবিধানে যুক্ত হওয়া ৭ক, ৭খ ও ৪৪(২) অনুচ্ছেদও অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে বাতিল করা হয়।

পরে হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে সুজন সম্পাদকসহ অন্যান্যরা লিভ-টু-আপিল দায়ের করলে গত ১৩ নভেম্বর তা মঞ্জুর করেন আপিল বিভাগ। এরপর কয়েক ধাপে শুনানির পর বুধবার আইনি যুক্তিতর্ক পর্ব শেষ হলো।

পঞ্চদশ সংশোধনীর মূল বিষয়বস্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পাশাপাশি এই সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করে সেটিকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। সংসদে নারীদের সংরক্ষিত আসন বাড়িয়ে ৫০টি করা হয়।

এছাড়াও শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান এবং রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ, ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রও সংবিধানে যুক্ত করা হয়েছিল।

নির্বাচন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তন ছিল এই সংশোধনীতে। আগে সংসদ ভেঙে যাওয়ার বা মেয়াদ শেষের পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সাধারণ নির্বাচনের বিধান থাকলেও, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদ বহাল থাকাবস্থায় মেয়াদ শেষের পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান যুক্ত করা হয়েছিল।

বৃহস্পতিবার আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ের মাধ্যমে দেশের শাসনতন্ত্রের এই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হতে যাচ্ছে, যার ওপর গভীর দৃষ্টি রাখছে গোটা দেশ।