চট্টগ্রাম: ভোর থেকে নিকষ কালো মেঘে ঢাকা আকাশ। কখনো গুঁড়ি গুঁড়ি, আবার কখনো মুষলধারে বৃষ্টি। গত কয়েকদিন ধরে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে সূর্যের দেখা নেই বললেই চলে। অবিরাম এই বর্ষণে থমকে গেছে চাটগাঁর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা, নিচু এলাকায় জমেছে পানি, আর পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারীদের মধ্যে বাড়ছে চরম আতঙ্ক।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি) জানিয়েছে, চট্টগ্রামে আগামী অন্তত আরও দুই দিন এই অতি ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। বুধবার (৮ জুলাই) সকাল ৬টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ২৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা আবহাওয়া বিজ্ঞানের ভাষায় ‘অতি ভারী বর্ষণ’ হিসেবে চিহ্নিত।
সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাব ও পূর্বাভাস আবহাওয়াবিদ আবদুল হামিদ জানান, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এই অবিরাম বৃষ্টিপাত হচ্ছে। তিনি বলেন, “চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত আগামী অন্তত আরও দুই দিন চলতে পারে।” বর্ষাকালে বৃষ্টি স্বাভাবিক হলেও, সাম্প্রতিক দিনগুলোর বিরতিহীন বর্ষণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
জরুরি প্রয়োজনে ছাতা মাথায় দিয়ে অফিসগামীদের যাতায়াত করতে হচ্ছে। রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা অনেক কমে গেছে এবং ফুটপাতের বিক্রেতারা প্রায় ক্রেতাশূন্য দিন কাটাচ্ছেন। পুনরায় কখন মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হবে—এই আশঙ্কায় অনেক বাসিন্দা ঘরের বাইরে বের হওয়া থেকে বিরত থাকছেন।
এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত বৈরী আবহাওয়ার কারণে চলমান উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়েছে। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বুধবার (৮ জুলাই) অনুষ্ঠিতব্য পরীক্ষাগুলো স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। পরীক্ষা স্থগিতের এই সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

পাহাড় ধসে ৬ জনের মৃত্যু ও চরম আতঙ্ক টানা এই বর্ষণ চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় পাহাড় ধসের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে ওঠা অস্থায়ী ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোতে বসবাসকারী হাজারো মানুষের মনে এখন কেবলই বেঁচে থাকার আকুতি। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নজরদারি জোরদার করেছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
এরই মধ্যে গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলা, রাঙামাটির বাঘাইছড়ি এবং কক্সবাজারে দেয়াল ধসে ও পাহাড় ধসের পৃথক ঘটনায় অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন।
রিয়াজউদ্দিন বাজারে জলাবদ্ধতা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা টানা বৃষ্টির কারণে নগরীর অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্য কেন্দ্র রিয়াজউদ্দিন বাজারসহ বেশ কয়েকটি নিচু এলাকা হাঁটু পানিতে তলিয়ে গেছে। জলাবদ্ধতার কারণে দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ায় ব্যবসায়ীরা চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন। তবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) দাবি করেছে, বৃষ্টি থামার সঙ্গে সঙ্গে পানি দ্রুত নেমে যাচ্ছে। তাদের মতে, নিয়মিত ড্রেন ও খাল পরিষ্কার করার কারণে এবার পরিস্থিতি তুলনামূলক দ্রুত স্বাভাবিক হচ্ছে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, বাংলাদেশ এখন মৌসুমি বায়ুর ভরা মরশুমে রয়েছে, যেখানে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা জলীয় বাষ্পপূর্ণ বাতাস ঘন মেঘের সৃষ্টি করছে। ফলে চট্টগ্রামের আকাশ থেকে মেঘ কেটে সূর্য উঁকি দেওয়ার সম্ভাবনা এই মুহূর্তে অত্যন্ত ক্ষীণ।