ব্যাপক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নেপালের ক্ষমতায় বসার ১০০ দিন পার করলেন ৩৬ বছর বয়সী র্যাপার থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়া বালেন্দ্র শাহ। এর মধ্যেই তিনি সরকারের কাজের ধরনে বড় ধরনের রদবদল এনেছেন, যদিও তিনি নিজে রয়ে গেছেন অনেকটা নিভৃতচারী।
কাঠমান্ডুর সাবেক এই মেয়র, যিনি সারা দেশে ‘বালেন’ নামেই বেশি পরিচিত, রোববার (৫ জুলাই) দায়িত্ব পালনের এই মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই তিনি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে কাজ শুরু করেছেন।
চমক দিয়ে শুরু ও দ্রুত পদক্ষেপ দায়িত্ব গ্রহণের ঠিক পরের দিনই তাঁর সরকারের নির্দেশে পুলিশ নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি এবং তাঁর সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যে ভয়াবহ গণ-অভ্যুত্থানের ফলে ওলি সরকারের পতন ঘটেছিল, সে বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিশনের সুপারিশেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তদন্ত চলাকালে পরে অবশ্য কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের সেই প্রথম পদক্ষেপটিই বলে দিচ্ছিল সামনের দিনগুলোতে প্রশাসন কীভাবে চলবে। পদক্ষেপগুলো ছিল অত্যন্ত দ্রুত ও প্রতীকী বার্তাবাহী, কিন্তু একই সঙ্গে সেগুলো আইনি বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার প্রতি প্রশাসনের ধৈর্যের অভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
নিভৃতচারী নেতা ও ভিন্নধারার কূটনীতি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও বালেন্দ্র শাহ নিজে খুব একটা জনসমক্ষে আসেন না। তিনি সাধারণত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমেই জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এমনকি নির্বাচনে জয়ের পর নিজের বিজয়ী ভাষণটিও তিনি দিয়েছিলেন একটি র্যাপ গানের মাধ্যমে।
নেপালের দীর্ঘদিনের প্রথা অনুযায়ী, যেকোনো নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফরটি হয়ে থাকে প্রতিবেশী ভারত বা চীনে। কিন্তু প্রথা ভেঙে বালেন্দ্র শাহ নিজে না গিয়ে সেই সফরের দায়িত্ব দিয়েছেন তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে। এছাড়া বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকও তিনি অনেকটা এড়িয়ে চলছেন।
এ প্রসঙ্গে সাংবাদিক প্রণয়া রানা বলেন, “গত তিন মাসে আমরা সেই ব্যক্তি সম্পর্কে খুব কমই জানতে পেরেছি, যাঁকে আমরা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করেছি। তাঁর উচিত আরও খোলামেলা হওয়া।”
‘এক্সপ্রেসওয়ে’তে সংস্কার ও অর্থনীতি দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক এলিটদের প্রতি ক্ষোভ এবং অর্থনৈতিক সুযোগের অভাব—এই দুই কারণে নেপালের তরুণ সমাজ রাজপথে নেমেছিল। সেই গণ-অসন্তোষের ভর করেই ৫ মার্চের সাধারণ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন বালেন্দ্র শাহ।
ক্ষমতায় এসেই সরকার সুশাসন, দুর্নীতি দমন, জনসেবা প্রদান এবং ডিজিটালাইজেশনকে সামনে রেখে ১০০ দফার একটি সংস্কার এজেন্ডা ঘোষণা করে। সরকারের দাবি অনুযায়ী, এর মধ্যে প্রায় ৭০টি পদক্ষেপ এরই মধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং বাকিগুলোর কাজ চলছে।
গত জুনে ক্ষমতাসীন ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’র এক সভায় বিরল এক জনসভায় শাহ বলেছিলেন, তাঁর প্রশাসন পরিবর্তনের দিকে একটি “এক্সপ্রেসওয়ে” বা দ্রুতগতির মহাসড়কে অবস্থান করছে। তিনি বলেন, “গন্তব্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত কোনো ব্রেক কষা হবে না।”
অর্থনীতি স্থিতিশীল করার পাশাপাশি অবকাঠামো, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতকে চাঙা করতে ২.১ ট্রিলিয়ন রুপি (১৩.৮ বিলিয়ন ডলার) ব্যয়ের বাজেট পেশ করেছে নতুন সরকার। বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে বলেন, “জাতি আজ ব্যাপক অর্থনৈতিক সংস্কারের এক নির্ণায়ক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে।”
প্রশংসা, সমালোচনা ও সতর্কবার্তা বালেন্দ্র শাহের দ্রুতগতির কাজের ধরন অনেকেরই প্রশংসা কুড়িয়েছে। সাংবাদিক সুধীর শর্মা বলেন, “সবচেয়ে বড় কথা হলো, এটি কাজ করার স্টাইল বদলে দিয়েছে। আগের সরকারগুলোর মতো না হয়ে, এই সরকার প্রথম দিন থেকেই কাজ শুরু করেছে। মনে হচ্ছে তারা ফলাফল-ভিত্তিক কাজে বিশ্বাসী।”
তবে এর তীব্র সমালোচকও রয়েছে। শুক্রবার এক বিবৃতিতে ওলির কমিউনিস্ট পার্টি সিপিএন-ইউএমএল জানিয়েছে, বর্তমান সরকারের কাজ “অত্যন্ত দুর্বল, অপরিপক্ব এবং বিতর্কিত”।
পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও শাহের সরকার আইন পাসের পরিবর্তে অধ্যাদেশ জারি করে দ্রুত সংস্কারের পথ বেছে নিয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এই পদ্ধতি সরকারের ভেতর ক্ষমতার ভারসাম্যকে (চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স) ক্ষুণ্ন করছে। এ ছাড়া একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে সাংবিধানিক পরিষদকে—যার সভাপতিত্ব করেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী—সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বিচারক নিয়োগসহ অন্যান্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
বস্তি উচ্ছেদের একটি উদ্যোগও ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। পাশাপাশি সংবিধান সংশোধন এবং নেপালের ফেডারেল ব্যবস্থা পুনর্গঠনের আলোচনা রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
২০২৫ সালের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক গবেষক আনুশা খানাল বলেন, “কাজ হচ্ছে ঠিকই, তবে কীভাবে কাজগুলো করা উচিত সে বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।”
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ২৩ বছর বয়সী তরুণ যুজন রাজভান্ডারি বলেন, এই সরকারের জন্ম হয়েছে ‘আন্দোলনের গর্ভ থেকে’, তাই তাদের অবশ্যই জনগণের কথা শুনতে হবে। তিনি বলেন, “এই সরকারের কাছে আমাদের অনেক প্রত্যাশা। তারা যে ফলাফল-ভিত্তিক কাজ করছে তা ভালো, কিন্তু সেই ফলাফল যদি আইনি ও যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে না আসে, তবে তা টেকসই হবে না।”
প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়নে সাংবাদিক প্রণয়া রানা বলেন, “প্রথম ১০০ দিন হলো সেই সময়, যখন সবার কাছ থেকে সরকার সবচেয়ে বেশি শুভেচ্ছা পায়। তবে এখন হয়তো খোদ জনগণের কাছ থেকেই সমালোচনা বাড়তে শুরু করবে।”