Brick Lane News

স্বর্ণময়ী থেকে মিমো ও আমাদের ডিজিটাল মবিং

স্বর্ণময়ী থেকে মিমো ও আমাদের ডিজিটাল মবিং

0452da3d b990 4e8d b54f e8c3521d7097 স্বর্ণময়ী থেকে মিমো ও আমাদের ডিজিটাল মবিং

 

 

জুয়েল রাজ –

২৫ এপ্রিল দিবাগত রাতে আত্মহত্যা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মুনিরা মাহজাবিন মিম । এবং একটি নোট লিখে রেখে যান , যেখানে তিনি তারই বিভাগের শিক্ষক এবং তার ঘনিষ্ঠ এক বান্ধবীর নাম লিখে যান। তবে তা আত্মহত্যার জন্য দায়ী করে নয় , তিনে লিখে যান “সুদীপ স্যার কে ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে , হানি এবং স্যার ভাল থেক, স্যারের গিফটগুলো ফেরত দিতে হবে । এই নোটের কারনে শিক্ষক সুদীপ চক্রবর্তী ও মিমোর বান্ধবী হানীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যায় পুলিশ , হানিকে মুচলেকা রেখে ছেড়ে দিলে ও সুদীপ চক্রবর্তীকে জেলে পাঠায়।

এই নোটের জের ধরে যে দিন সুদীপ চক্রবর্তীকে ৩ দিনের রিমান্ড দেয় আদালত , ঠিক একই দিনে অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘ঢাকা স্ট্রিম’-এর গ্রাফিক ডিজাইনার ও সংবাদকর্মী স্বর্ণময়ী বিশ্বাস-এর আত্মহত্যার ঘটনায় পুলিশ দীর্ঘ তদন্ত শেষে দাখিল করা চূড়ান্ত প্রতিবেদনে (ফাইনাল রিপোর্ট) তার মৃত্যুকে ‘আত্মহত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

কিন্তু এই ঘটনার পর ঢাকা স্ট্রিমের বাংলা কনটেন্ট এডিটর আলতাফ শাহনেওয়াজের বিরুদ্ধে প্ররোচনা ও যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু পুলিশি প্রতিবেদনে হ্যারাসমেন্টের বদলে পারিবারিক কারণই তাঁর মৃত্যুর মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। সুদীপ চক্রবর্তীর রিমান্ড ,জামিন না পাওয়া এবং স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যা মামলার রায় প্রকাশ কাকতালীয় ভাবেই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠে।

 

স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যার পর তার কর্মক্ষেত্রের একটি পুরোনো অভিযোগকে সামনে এনে ধীরে ধীরে এমন এক সংঘবদ্ধ অনলাইন ক্যাম্পেইন তৈরি হয়, যা শুধু আলতাফ শাহনেওয়াজ নন, তার স্ত্রী ফাতেমা আবেদিন নাজলা এবং তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এন’স কিচেন সহ তাদের সামাজিক জীবন , ব্যাক্তি জীবন, অর্থনৈতিক জীবন সব তছনছ করে দেয় প্রায়।
পুলিশের তদন্ত ,আদালতের রায় কিংবা ন্যায় বিচার নয়, শুরু হয় আলতাফ শাহনেওয়াজ তার স্ত্রীর প্রতি এক ধরণের প্রতিশোধ পরায়াণতার প্রকাশ।
এখন আদালত যখন স্বর্ণময়ীর হত্যার দীর্ঘ তদন্ত শেষে স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যায় ,আলতাফ শাহনেওয়াজ এর কোন সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়নি।কিন্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার আগেই শুধু আলতাফ শাহনেওয়াজ নয়,তার স্ত্রী সহ তাদের বিরুদ্ধে রায় দিয়ে দেয়। তখনকার সময়ের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যদি এখন দেখেন, তাহলে বুঝতে পারবেন ,আলতাফ শাহনেওয়াজ যে এখনো বেঁচে রয়েছেন সেটিই বরং আশ্চর্যজনক! বিগত ডিজিটাল মবিং এর জন্য কেউ কি আলতাফ শাহনেওয়াজ এর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন ? চান নি।

মিমো আত্মহত্যার পর ও আমরা একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে । আমরা কেউই জানিনা মিমোর এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর রহস্য কি ? কিন্ত মিমোর চিরকুটের সূত্র ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সরব হয়ে উঠে সুদীপ চক্রবর্তীর বিচারের । যা বরং ন্যায়বিচারকে ব্যহত করে। সুদীপ চক্রবর্তী আদতেই এই আত্মহত্যায় কোন ভাবে মিমোকে প্ররোচিত করেছেন কী না ,সেটি একমাত্র পুলিশি তদন্তেই বের হওয়া সম্ভব ।
কিন্ত তার আগেই সুদীপ চক্রবর্তী যে বিভাগের শিক্ষক ,সেই বিভাগেরই শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে শিক্ষকরা সহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নৈতিক শিক্ষার বিচার শুরু করেছেন ।ব্যাক্তিগত ক্ষোভ ও অভিযোগের খাতা খুলে বসেছেন। যেখানে মিমোর জন্য ন্যায় বিচার পাওয়ার চেয়ে ব্যাক্তি সুদীপের চরিত্র হনন ও সুদীপকে অপরাধী প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। মিমোর আত্মহত্যার নেপথ্য কারণ প্রমাণিত হওয়ার আগেই , তার শিক্ষা অনুষদের আভ্যন্তরীণ দূর্নীতি স্বজনপ্রীতি, শিক্ষক নিয়োগ দূর্নীতির সংস্কার এর দাবী নিয়ে সরব হয়েছেন, এবং সেই ক্যাম্পেইন এ বলির পাঁঠা বানিয়ে ফেলছেন সুদীপ চক্রবর্তীকে।
ঠিক যেভাবে হয়েছিল স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যার পর ,আলতাফ শাহনেওয়াজ এর বিরুদ্ধে । ব্যাক্তি আলতাফ শাহনেওয়াজ কিংবা সুদীপ চক্রবর্তীর চারিত্রিক সনদপত্রের চেয়ে ও জরুরী ছিল আত্মহত্যা রোধে আমাদের কি করণীয় ছিল। এই ধরণের মেধাবীরা কেন আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, বিশ্ববিদ্যালয় বা কর্মস্থলে
রাষ্ট্রীয় ভাবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ তৈরী করা, আর যেন কোন স্বর্ণময়ী বা মিমো এই পথ বেছে না নেয় তার পরিবেশ তৈরি করা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্ত আমরা বেছে নিয়েছি অনলাইন ট্রায়াল । অপরপক্ষে থাকা মানুষটি যদি মানসিক ভাবে অধিক পরিমাণে শক্ত না হন ,এই বিচার তাকে ও এক ভীন্ন মৃত্যুর পথে ঠেলে দেয়। একটি ন্যায়বিচারের দাবীতে অন্য আরেকটি জীবনের প্রতি অন্যায় করছি কী না , সেই ভাবনাটা করছি না।

ভুক্তভোগীর পরিবারের করা মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, অভিযুক্ত শিক্ষক সুদীপ চক্রবর্তীর সঙ্গে মিমোর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। ঘটনার রাতে তাদের মধ্যে ভিডিও কলে কথোপকথনের পর মিমো মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং ওই আলাপের পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি আত্মহত্যা করেন ।
পরিবারের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়, মিমোর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে থাকা হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ ও কল রেকর্ডে দুজনের সম্পর্ক এবং যোগাযোগের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

মামলায় দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এ বিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধারায় (আত্মহত্যায় প্ররোচনা) দোষী সাব্যস্ত করতে হলে কেবল সম্পর্ক বা কথোপকথন নয়, প্ররোচনার সরাসরি বা পরোক্ষ প্রমাণ দেখাতে হয়।

মিমোর আত্মহত্যার পরপরই তার মায়ের একটি দীর্ঘ মোবাইল ফোন কথোপকথন ভাইরাল হয়েছে , যেখানে মা ,বাবা পরিবার সহ তার কাছের মানুষের সাথে সম্পর্ক, গত মাসের ৫ তারিখে মিমোর প্রেমিকের অন্য মেয়ের সাথে বিয়ে হয়ে যাওয়া নিয়ে তার মানসিক বিপর্যয় ,ছেলে বন্ধুদের সাথে তার উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপন। প্রথম বিয়ে ভেঙে যাওয়া , বারবার আত্মহত্যা বা নিজেকে আঘাত করার প্রবণতা এইসব বিষয় তিনি মিমোর এক বান্ধবীকে বয়ান করছেন। একজন মা কতটা নিরুপায় ছিলেন ,সেই অসহায়ত্ব বারবার উল্লেখ করেছেন সেখানে। মিমোর সেই জীবন ও যেমন একান্তই তার ,এই বিষয়গুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে ,তার চারিত্রিক সনদপত্র দেয়া ও কোনভাবে সমুচীন নয়।

২৫ তারিখ ,মৃত্যুর পূর্ব সন্ধ্যায় সুদীপ চক্রবর্তীর অফিসের মিটিং থেকে বের হওয়ার সিসিটিভি ফুটেজে দৃশ্যমান তিনি ফোনে কথা বলে পায়চারী করছেন । সেই ফোনের অন্যপ্রান্তে কে ছিলেন ? কেউ প্রশ্ন তুলে নি। সুদীপ চক্রবর্তীর সাথে কথা হয়েছে রাত ১ টায়।আর মিমো আত্মহত্যা করেছেন ভোর ৫ টায় প্রায় ৪ ঘন্টা পর। এই দীর্ঘ ৪ ঘন্টা সময় কি ঘটেছিল তার জীবনে ?
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই সব ফুটেজ আদালত চাইলে দিতে বাধ্য। কিন্ত সেটি না করে এইসব পাবলিক করে দেয়ার ঘটনায় এক ধরনের পক্ষপাতিত্ব পরিলক্ষিত হচ্ছে।

মিমো আত্মহত্যা করেছে এই বিষয়টি প্রমাণিত, সেই আত্মহত্যায় যদি সুদীপ চক্রবর্তী কোন ভাবে দায়ী থাকেন , আইনত নিশ্চয় তিনি সাজা ভোগ করবেন । আইনকে সেই সুযোগটা দেয়া উচিত । কিন্ত তার আগেই মিমো , মিমোর পরিবার ,তার ব্যাক্তি জীবন নিয়ে টানাটানি , সুদীপের দীর্ঘ ক্যারিয়ার তার ব্যাক্তিজীবন সবকিছুকে আমরা বিচারের নামে দুর্বিষহ করে তুলেছি।

অনলাইন ট্রায়াল কোনো সমাধান নয়, বরং এটি আরেকটি মৃত্যুর পথ তৈরি করে। আমরা যদি সত্যিকারের মানবিক সমাজ হতে চাই, তবে আমাদের ঘৃণা ছড়ানো বন্ধ করে সুস্থ তদন্তের সুযোগ দিতে হবে। মিমোর বিষাদসিন্ধু যেন আমাদের ভেতরের মানুষটাকে ডুবিয়ে না দেয়, বরং আমাদের প্রশ্ন করতে শেখাক—কেন আমাদের চারপাশটা এতটা বিষাক্ত হয়ে উঠেছ ?