Skip to main content

Brick Lane News

যুক্তরাষ্ট্র-চীন-পাকিস্তান-তুরস্ক অক্ষ এবং ভারতের নিরাপত্তা সংকট

যুক্তরাষ্ট্র-চীন-পাকিস্তান-তুরস্ক অক্ষ এবং ভারতের নিরাপত্তা সংকট

তুরস্কের পথে হাঁটছেন  তারেক রহমান

আমেরিকান অর্থনীতি এবং চীনা অর্থনীতি অত্যন্ত গভীরভাবে পরস্পর জড়িত। বিশেষ করে আমেরিকান বন্ড মার্কেট চীনা ঋণদাতাদের উপর নির্ভরশীল এবং আমেরিকান উৎপাদকরা চীনা যন্ত্রাংশ ও অ্যাক্সেসরিজ উৎপাদকদের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বিশেষ করে সামরিক এবং উচ্চ প্রযুক্তির অ্যাক্সেসরিজ চীনা উৎপাদকদের কাছ থেকে আসে এবং রেয়ার আর্থ রিফাইনারির ক্ষেত্রেও একই চিত্র। এ কারণে চীনের বিরুদ্ধে অত্যধিক চাপ আমেরিকায় বিশাল মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি করছে এবং আমেরিকান উৎপাদকদের সাপ্লাই চেইনে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাচ্ছে—বিশেষ করে তাদের সামরিক সরঞ্জাম ও উচ্চ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে।

দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির আকাশে অস্থির পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। কূটনৈতিক মহলে তোলপাড় চলছে। সম্প্রতি ঢাকার অভিজাত হোটেল র‌্যাডিসন ব্লুতে একটি অতি-গোপনীয় বন্ধ-দরজা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে পাকিস্তানের ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই) এবং বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই ও এনএসআই-এর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুসারে, বৈঠকের মূল এজেন্ডা ছিল ভারতের সিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেন্স নেক’ সংক্রান্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ অন্তর্ভুক্ত। এই ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, অঞ্চলে ভারতের নিরাপত্তা কর্ডন ভেঙে ফেলতে এবং পাকিস্তানি গোয়েন্দা সম্পদকে শক্তিশালী করতে একটি বড় আন্তর্জাতিক অক্ষ সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

তুরস্ক-পাকিস্তান লবি এবং তারিক রহমানের নতুন কৌশল বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারিক রহমান একটি কৌশলগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিনি এখন সরাসরি পাকিস্তান ও তুরস্ক লবির দিকে ঝুঁকছেন। এই লবি তারিক রহমানের জন্য একটি শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করছে, কারণ তুরস্ক বর্তমানে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় পরাশক্তির সাথেই ভালো সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এই তুরস্ক-পাকিস্তান অক্ষ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ‘কৌশলগত যুদ্ধবিরতি’র একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউ-টার্ন’ এবং মিয়ানমার সমীকরণ মিয়ানমারের রেয়ার আর্থ উপকরণ নিয়ন্ত্রণের যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল ব্যর্থ হওয়ায় ওয়াশিংটন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। এখন তারা অঞ্চলে নিজেদের স্বার্থ অর্জনে তুরস্ক-চীন-পাকিস্তান রুট ব্যবহার করতে চায়। ভারত একসময় ‘কোয়াড’-এ অত্যধিক সক্রিয় হয়ে চীন থেকে দূরে সরে গিয়েছিল, যা দিল্লির জন্য কৌশলগত ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। কারণ তাদের স্বার্থের খাতিরে যুক্তরাষ্ট্র চীন-পাকিস্তান-তুরস্ক অক্ষের সাথে আপস করেছে এবং ভারতের পিঠে এক ধরনের ‘কূটনৈতিক ছুরি’ মেরেছে। ফলে ভারতকে এখন মূলত বাংলাদেশকেন্দ্রিক তাদের স্বার্থের লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে।

 

ভারত -রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে নিজের আধিপত্য ভেঙে পড়ার সাথে সাথে যুক্তরাষ্ট্র এখন ‘বহুমেরু’ বিশ্ব প্রতিরোধ করতে মরিয়া। তারা চীন ও যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে একটি ‘দ্বিমেরু’ বিশ্ব ব্যবস্থা বজায় রাখতে চায়। এই লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ভারতকে যৌথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে একটি অলিখিত চুক্তিতে পৌঁছেছে বলে বিশ্বাস করা হয়।

 

যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে বেইজিংয়ের সাথে কৌশলগত জোট গড়েছে, যা চীনকে অঞ্চলে তিস্তা প্রকল্প এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) বাস্তবায়নে অনুমতি দিয়েছে।

 

তারা এই বিশাল ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ অর্জনে বাংলাদেশকে প্রধান ‘ঘাঁটি’ বা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করেছে।বিশ্ব রাজনীতিতে কূটনীতির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো শক্তি বাজার। ওপেক একসময় তেল বাজারের ৫০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করত, যা এখন ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো এখন নিজস্ব দামে তেল বিক্রি করতে পারবে, যা বিশ্বব্যাপী তেল বাজার নিয়ন্ত্রণে আমেরিকার ক্ষমতাকে গুরুতরভাবে সীমিত  করবে।

আমেরিকার বর্তমান চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের একটি অন্যতম কারণ হলো তাইওয়ানের সেমিকন্ডাক্টর শিল্প। আমেরিকা মনে করে এই যন্ত্রাংশ ও শিল্প স্থানান্তর করতে আরও ৬ থেকে ৭ বছর সময় লাগবে। বর্তমানে আমেরিকার অর্থনীতি ভয়াবহ অবস্থায় থাকায় চীনের সাথে সরাসরি সংঘাতে জড়ানো তাদের জন্য বিপজ্জনক। এই সময় পাওয়ার জন্য চীনের সাথে নীতিগত চুক্তি করাকেই তারা শ্রেয় মনে করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের এখন ‘কোয়াড’ থেকে সরে আসা উচিত এবং রাশিয়া-ভারত-চীন (আরআইসি) জোটকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। যদি ভারত চীন ও রাশিয়ার সাথে পুনরায় জোটবদ্ধ হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের এই যোগসাজশকে দুর্বল করা সম্ভব। এতে তুরস্ক ও পাকিস্তানের ক্রিপ্টোকারেন্সির কালোবাজারি ও অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানভিত্তিক ‘সন্ত্রাসী ব্যবসা’ দুর্বল হয়ে পড়বে।

 

বৈঠকে সিলিগুড়ি করিডর নিয়ে আলোচনা ভারতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। মাত্র ২২ কিলোমিটার চওড়া এই করিডর উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মূল ভারতের সাথে যুক্ত করে। অঞ্চলে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সম্পদের তৎপরতা এবং বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার সাথে তথ্য শেয়ারিং ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ওড়িশা ও আসামের মতো রাজ্যগুলোতে প্রভাবের নতুন মানচিত্র আঁকা হচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়া এখন একটি বিশাল দাবার বোর্ডে পরিণত হয়েছে। যেখানে পরাশক্তিরা পুরনো শত্রুতা ভুলে গিয়ে নিজেদের স্বার্থে ভারতকে কোণঠাসা করতে হাত মিলিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানের গোয়েন্দা তৎপরতা দিল্লির জন্য অশুভ সংকেত। যদি ভারত দ্রুত ‘আরআইসি’ নীতিতে ফিরে না আসে, তাহলে আগামী দিনগুলোতে অঞ্চলে তার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। ঢাকায় অনুষ্ঠিত সেই গোপন বৈঠক শুধু আলোচনা ছিল না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী নীলনকশা।

সেজন্য পল কাপুর বলেছেন, ইন্দোপ্যাসিফিক কৌশলে আমেরিকার শীর্ষ ভূ-রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশকে প্রয়োজন। আমেরিকা অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ভারতের চেয়ে বাংলাদেশকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছে, যার অর্থ আমেরিকা মিয়ানমার ও ভারত নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে সামরিক ম্যাপিং করবে।