সাতচল্লিশ-এর দেশভাগ কেবল মানচিত্রে কাঁটাতারের রেখা টানেনি, জন্ম দিয়েছিল এক অদ্ভুতুড়ে রাষ্ট্রতত্ত্বের। যে পাকিস্তান হওয়ার কথা ছিল শোষিত মানুষের চারণভূমি, তা এক লহমায় পর্যবসিত হলো জেনারেলদের রণক্ষেত্রে।

ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো, পাকিস্তান রাষ্ট্রটি কোনো সেনাবাহিনীর দেশ হয়ে ওঠেনি, বরং সেনাবাহিনীই গিলে খেয়েছে একটি আস্ত রাষ্ট্রকে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর রহস্যময় অকাল মৃত্যু থেকে শুরু করে ‘মাদারে মিল্লাত’ ফাতেমা জিন্নাহর করুণ বিদায়-প্রতিটি মোড়ে লুকিয়ে আছে উর্দিধারী উচ্চাভিলাষের কালো ছায়া।

“যে ভূখণ্ডে বন্দুকের নল জনমতের চেয়ে বেশি শক্তিশালী, সেখানে গণতন্ত্র কোনোদিন ডালপালা মেলতে পারে না।”

পাকিস্তান আজও এক আত্মপরিচয়ের সংকটে ঘুরপাক খাচ্ছে, কারণ তারা মানুষের শাসনের বদলে বুটের শব্দকে সার্বভৌমত্ব মনে করার ঐতিহাসিক ভুলটি আঁকড়ে ধরে রেখেছে। এই বিষাক্ত বিবর্তনের মূলে ছিল ক্ষমতার প্রতি এক আদিম লালসা। ১৯৫১ সালে লিয়াকত আলী খানের হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে আইয়ুব খানের সামরিক জান্তার উত্থান-সবই ছিল রাষ্ট্রকে ব্যারাকে বন্দি করার এক সুদূরপ্রসারী নকশা। পাকিস্তান রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সেনাবাহিনী এমন এক ‘ডিপ স্টেট’ তৈরি করল, যেখানে নির্বাচন ছিল লোকদেখানো সার্কাস আর বিচারব্যবস্থা ছিল জেনারেলদের আজ্ঞাবহ।

ফাতেমা জিন্নাহ যখন সেই একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, তাকেও দেশদ্রোহিতার তকমা দিয়ে নিঃশব্দে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই চক্রান্তের পরম্পরাই প্রমাণ করে যে, পাকিস্তান কোনোদিন সাধারণ মানুষের দেশ হতে পারেনি; বরং তা হয়ে রইল এক সামরিক এস্টেট।

“ট্র্যাজেডির সবচেয়ে ভয়ংকর অধ্যায়টি রচিত হতে শুরু করল যখন এই একই বিষবৃক্ষের বীজ রোপণ করার চেষ্টা করা হলো এক সাগর রক্তে ভেজা বাংলাদেশের পবিত্র মাটিতে।”

১৯৭১-এর পরাজয় স্বাধীনতা বিরোধীদের কাছে কেবল একটি সামরিক হার ছিল না, ছিল তাদের কয়েক প্রজন্মের সাম্প্রদায়িক ও আধিপত্যবাদী আদর্শিক অস্তিত্বের বিনাশ। ১৬ই ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে যখন তাদের পরাজয় নিশ্চিত হলো, তখন সেই পরাজিত শক্তি ও তাদের দোসর রাজাকারের দল গ্লানি নিয়ে গর্তে ঢুকে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের হৃদয়ে নিভে যায়নি এক ভয়ংকর নীল নকশা-বাংলাদেশকে একটি ‘রাজাকারদের অভয়ারণ্যে’ পরিণত করা।

সাতচল্লিশের সেই পাকিস্তানি ভূত যেন নতুন অবয়বে বাংলাদেশের মাটিতে বিচরণ করতে শুরু করল। এই গোষ্ঠীটি গত কয়েক দশকে গিরগিটির মতো রং বদলেছে; কখনো ধর্মের বর্ম পরেছে, কখনো চতুর রাজনীতির পিঠে সওয়ার হয়েছে। পঁচাত্তরের পনেরো আগস্টের ট্র্যাজেডি থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রতিটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে এই পরাজিত শক্তির সূক্ষ্ম সুতোর টান স্পষ্ট। তারা বুঝে গিয়েছিল, সরাসরি যুদ্ধ করে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা থামাানো সম্ভব নয়, তাই তারা বেছে নিল ‘ভেতর থেকে ক্ষয় করার’ কৌশল। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের এমন কোনো চোরাবালি নেই যেখানে এই অপশক্তির পদচিহ্ন নেই। ক্ষমতার মসনদ দখলের জন্য তারা যেমন ভিনদেশি প্রভুদের পা চাটতে কুণ্ঠাবোধ করেনি, তেমনি দেশের অভ্যন্তরেও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কিংবা অস্থিতিশীলতার বীজ বুনে দিতে কসুর করেনি।

“মূলত ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত পাকিস্তানের যে রাজনৈতিক বিবর্তন, তা ছিল গণতন্ত্রকে জবাই করে সামরিক ও আমলাতান্ত্রিকতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস।”

আর ১৯৭১ পরবর্তী বাংলাদেশে এই একই শক্তি কাজ করেছে ‘বাংলাদেশি’ লেবাসে পাকিস্তানি চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করতে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী যা করেছে সরাসরি বন্দুকের জোরে, এদেশের স্বাধীনতাবিরোধী চক্র তা করতে চেয়েছে সাংস্কৃতিক বিকৃতি, ইতিহাস বিকৃতি আর সুগভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে। তারা একেক সময় একেক রাজনৈতিক দলের কাধে সওয়ার হয়ে মূলধারার রাজনীতিতে নিজেদের প্রাসঙ্গিক রেখেছে এবং সুযোগ বুঝে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে নিজেদের লোক বসিয়ে দিয়েছে।

আজকের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এটি স্পষ্ট যে, পাকিস্তানের গণমানুষ যেমন আজও তাদের রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরে পায়নি, তেমনি বাংলাদেশেও সেই পরাজিত অপশক্তি আজও ওত পেতে আছে রাষ্ট্রকে তার মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে। ১৯৪৭-এর সেই কুচক্রী উত্তরাধিকার আজও শেষ হয়ে যায়নি; বরং তা ভিন্ন ভিন্ন রূপে সক্রিয়।

“যে জাতি তার শত্রুর ছদ্মবেশ চিনতে ভুল করে, তাকে বারবার ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হতে হয়।”

স্বাধীনতাবিরোধী এই বিষচক্রের মূলোৎপাটন না করা পর্যন্ত বাংলাদেশের সত্যিকারের মুক্তি ও গণতান্ত্রিক বিকাশ সর্বদা এক অদৃশ্য সুতোর টানে বন্দি হয়ে থাকবে। ইতিহাসের এই ধারালো আয়নায় নিজেদের মুখ দেখা আজ সবচেয়ে জরুরি।