ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত সোমবার ব্যক্তিগত বিমানে করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে এক গোপন সফরে গিয়েছিলেন। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল-১২ এবং বার্তা সংস্থা রয়টার্সের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি আবুধাবিতে চার ঘণ্টা অবস্থান করেন এবং স্থানীয় সময় বিকেল ৩টা ১০ মিনিটে সেখানে অবতরণ করেন। এই সফরে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তবে এ বিষয়ে কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া বা মন্তব্য প্রদান করেনি। টাইমস অব ইসরায়েল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ আমিরাতের বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল–১২ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে এই তথ্য প্রকাশ করেছে। চ্যানেল–১২-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, গত সপ্তাহের সোমবারে স্থানীয় সময় দুপুরের কিছুক্ষণ পর ব্যক্তিগত বিমানে করে নেতানিয়াহু আবুধাবির উদ্দেশে রওনা হন। একই সময়ে তিনি কঠিন পুনর্নির্বাচন প্রচারণার মুখোমুখি হয়েছেন। বৈঠকটির বিষয়ে অবগত একটি সূত্র সে সময় জানিয়েছিল, ২৬ মার্চ আবুধাবির ওমান সীমান্তবর্তী মরূদ্যান শহর আল-আইনে নেতানিয়াহু ও এমবিজেড বৈঠক করেছিলেন।
এই সফরের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এর মূল কারণ হলো ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার প্রায় দেড় সপ্তাহ আগে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের পক্ষ থেকে নেতানিয়াহুকে দেওয়া একটি কথিত সতর্কবার্তা। হারেৎজ পত্রিকার দাবি অনুযায়ী, এমবিজেড নামে পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই নেতা ইসরায়েলকে একটি বড় ধরনের হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। অভিযোগ উঠেছে যে, ওই বার্তাটি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে পৌঁছানো হয়নি। যদিও নেতানিয়াহু বরাবরই এই দাবি অস্বীকার করে আসছেন এবং সংশ্লিষ্ট সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। ইসরায়েলে চলমান এক বিতর্কের মধ্যেই এই সফরটি অনুষ্ঠিত হয়। বিরোধী নেতারা ৭ অক্টোবরের হামলার আগে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যে ব্যর্থতা ছিল, তার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে দায়ী করেছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাত এসব বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানালেও জানিয়েছে যে, ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের পর থেকেই উভয় দেশের মধ্যে খোলামেলা যোগাযোগের চ্যানেল বিদ্যমান। এর আগে আমিরাতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, তারা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করলেও তা মূলত রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হয়, সরাসরি নেতাদের পর্যায়ে নয়। উল্লেখ্য যে, এর আগেও মে মাসে নেতানিয়াহুর দপ্তর তার উপসাগরীয় অঞ্চলে গোপনে সফরের বিষয়টি স্বীকার করেছিল। সেই সফরে ২৬ মার্চ আল-আইন শহরে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার বৈঠক হয়েছিল বলে জানা যায়।
অতীতের সেই বৈঠক নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। চ্যানেল-১২ এর তথ্যমতে, আমিরাতের কর্মকর্তারা বৈঠকটি গোপন রাখতে অনুরোধ করলেও নেতানিয়াহু তা প্রকাশ করে দিয়েছিলেন। সে সময় জানা গিয়েছিল, নিজের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নাফতালি বেনেতের আমিরাত সফরের আগাম বার্তার কারণে নেতানিয়াহু সেই বৈঠকটি প্রকাশ্যে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা আমিরাতকে ক্ষুব্ধ করেছিল। মূলত ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় আঞ্চলিক নিরাপত্তার খাতিরে আমিরাত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের নীতি গ্রহণ করে। আব্রাহাম অ্যাকর্ডস স্বাক্ষরের পর থেকেই ইসরায়েলের সঙ্গে আমিরাতের এই নতুন কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।