শ্রীলংকার উত্তরাঞ্চলে এক বিশাল গণকবরের সন্ধান পাওয়ার ঘটনায় নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অনুসন্ধানে ওই এলাকা থেকে শিশু ও নবজাতকসহ সর্বমোট ৫৭২ জন মানুষের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। কয়েক দশক আগে শ্রীলংকার গৃহযুদ্ধের সময় এক সেনাসদস্যের জবানবন্দির সূত্র ধরে এই গণকবরটির সন্ধান মেলে। ওই সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে সেই সময়কার এক তরুণীকে নির্যাতন ও প্রাণহানির অভিযোগে বিচার চলছিল।
উল্লেখ্য যে, শ্রীলংকায় ১৯৮৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৬ বছরব্যাপী গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই সংঘাত দেশটিকে জাতিগতভাবে বিভক্ত করে ফেলেছিল। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সিংহলী-প্রধান সরকারের বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে লড়াই করেছিল তামিল টাইগার বিদ্রোহীরা। এই দীর্ঘ লড়াইয়ে আনুমানিক এক লাখ মানুষ প্রাণ হারান এবং প্রায় ২৩ হাজার মানুষ নিখোঁজ হন, যাদের বেশিরভাগই তামিল সম্প্রদায়ের। ১৯৯৫ সালে সেনাবাহিনীর অভিযানের পর জাফনা উপদ্বীপের নিয়ন্ত্রণ পুনর্দখলের ঘটনা এই যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় ছিল, যা শেষ পর্যন্ত ২০০৯ সালে টাইগারদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে। যুদ্ধের পুরো সময়জুড়েই নিরাপত্তা বাহিনী এবং তামিল টাইগার—উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই নৃশংসতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।
দীর্ঘকাল ধরে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে পরিবারের সদস্যরা এবং মানবাধিকারকর্মীরা পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও বিচারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। ভুক্তভোগী এক পরিবারের সদস্য আক্ষেপ করে বলেন, “সে ছিল আমার একমাত্র ছেলে। তার কথা মনে করে আমি রোজ ঘুমের মধ্যে কেঁদে উঠি। তাকে ছাড়া আমার জীবন এখন শূন্য।” দীর্ঘসূত্রতা ও অতীতের তদন্তগুলোর ওপর আস্থা হারিয়ে ভুক্তভোগীরা বর্তমানে গভীর হতাশায় ভুগছেন। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এ মাসের শুরুতে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, গুম ও নির্যাতনের অনেকগুলো মামলা আজও স্থবির হয়ে পড়ে আছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রধান রোরি মাঙ্গোভেন বিবিসিকে জানান, ভুক্তভোগীরা দশকের পর দশক ধরে বেদনা নিয়ে বেঁচে আছেন। তিনি আন্তর্জাতিক সহায়তার মাধ্যমে এসব তদন্তে আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দিয়েছেন। তবে শ্রীলংকার সরকার শুরু থেকেই এই জাতীয় নৃশংসতা নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। ২০১৮ সালে সরকার ‘অফিস অব দ্য মিসিং পারসন্স’ (ওএমপি) নামক একটি স্বাধীন সংস্থা গঠন করে, কিন্তু অধিকার গোষ্ঠীগুলো এর কার্যকারিতা ও দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে বারবার সমালোচনা করেছে। সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে যা সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ আদালতে পেশ করা হবে। এদিকে, অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনরা এখনো ভয়ভীতি উপেক্ষা করে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গত ফেব্রুয়ারিতে শ্রীলংকার উত্তরাঞ্চলে যখন একটি গণকবরের সন্ধান মেলে, সেটি পরিকল্পিতভাবে খুঁড়ে তোলা কোনও কবরস্থান ছিল না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সে সময় জাফনার চেম্মানি এলাকায় একটি শ্মশানের পরিধি বাড়াতে খননকাজ করছিলেন শ্রমিকরা, আর তখনই তারা সেখানে হঠাৎ মানব দেহাবশেষ খুঁজে পেতে শুরু করেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অগাস্টের মধ্যে প্রত্নতত্ত্ববিদরা সেখানে খননের তৃতীয় ধাপ শেষ করেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সেখানে মৃতদের সঙ্গে তাদের নানা ব্যবহার্য জিনিসও পাওয়া যায়; যেমন: চুড়ি, স্কুলব্যাগ, দুধের বোতল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এটি শ্রীলংকায় এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে বড় গণকবর বলে মনে করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, সেখানকার মরদেহগুলো নিখোঁজ হওয়া বেসামরিক মানুষদের।