লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেট বরোতে আবারো বিপুল ভোটে পুনর্নির্বাচিত হলেন লুৎফুর রহমান । বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি ৩৫,৬৭৯ ভোট পেয়ে আবারও এক্সিকিউটিভ মেয়র নির্বাচিত হন।
উচ্চ ভোটার উপস্থিতির এই নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেয়েছে লেবার পার্টি। দলটির মেয়র প্রার্থী পেয়েছেন মাত্র ১৯,৪৫৪ ভোট, যা গ্রিন পার্টির প্রার্থীর চেয়ে মাত্র ২৩১ ভোট বেশি। গ্রিন প্রার্থী পেয়েছেন ১৯,২২৩ ভোট। ফলে লেবার কার্যত তৃতীয় স্থানে নেমে যাওয়ার পরিস্থিতিতে পড়ে।
২০১০ সালে প্রথমবার নির্বাচিত হয়ে যুক্তরাজ্যে প্রথম বর্ণ সংখ্যালঘু ব্যক্তি হিসেবে এক্সিকিউটিভ মেয়রের ইতিহাস গড়েন লুৎফুর রহমান। এরপর ২০১৪, ২০২২ এবং এবার ২০২৬ সালে পুনর্নির্বাচিত হয়ে তিনি চতুর্থবারের মতো এই পদে নির্বাচিত হলেন।
তার দল ২০২২ সালেই ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। লন্ডনের কোনো বরোতে লেবার, কনজারভেটিভ বা লিবারেল ডেমোক্র্যাটসের বাইরে অন্য কোনো দল হিসেবে প্রথমবারের মতো পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে দলটি।
নির্বাচনী প্রচারণায় লুৎফুর রহমান ও অ্যাসপায়ারকে সমর্থন দেন সাবেক লেবার নেতা এবং তার রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম । প্রচারণা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে করবিন বলেছিলেন, লুৎফুর রহমান “দেখিয়ে দিয়েছেন একটি রূপান্তরমূলক স্থানীয় কাউন্সিল কেমন হতে পারে।” লন্ডনের স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকায় লেখা এক নিবন্ধে তিনি অন্যান্য কাউন্সিলকে টাওয়ার হ্যামলেটসের মডেল অনুসরণের আহ্বানও জানান।
লুৎফুর রহমানের নতুন নির্বাচনী ইশতেহারে সবচেয়ে আলোচিত প্রতিশ্রুতিগুলোর একটি হলো নিম্ন আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে ভ্রমণ সুবিধা চালু করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগামী শিক্ষার্থীদের জন্য টিউব, ওভারগ্রাউন্ড ও বাসে ফ্রি ট্রাভেল পাস দেওয়া হবে। এটি বাস্তবায়িত হলে টাওয়ার হ্যামলেটস হবে যুক্তরাজ্যের প্রথম কাউন্সিল, যারা এ ধরনের উদ্যোগ নেবে।
এর আগে তার প্রশাসন দেশের প্রথম কাউন্সিল হিসেবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষার্থীর জন্য ইউনিভার্সাল ফ্রি স্কুল মিল চালু করে এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া Education Maintenance Allowance (EMA) পুনরায় চালু করে আলোচনায় আসে। নতুন ট্রাভেল পাস উদ্যোগের লক্ষ্য হচ্ছে যাতায়াত ব্যয়ের কারণে যেন কোনো তরুণ উচ্চশিক্ষা থেকে পিছিয়ে না পড়ে।
নির্বাচনে বিজয়ের পর প্রতিক্রিয়ায় লুৎফুর রহমান বলেন,
“টাওয়ার হ্যামলেটসের জনগণকে ধন্যবাদ, তারা আবারও আমার ওপর আস্থা রেখেছেন যাতে আমরা জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটে সহায়তা এবং সাশ্রয়ী ও সামাজিক আবাসন নির্মাণের রূপান্তরমূলক কর্মসূচি এগিয়ে নিতে পারি।
“মানুষ ভয় ও বিভেদের রাজনীতির বদলে আশার রাজনীতি বেছে নিয়েছে। আমাদের থামাতে বিরোধীরা মরিয়া ও বিভেদমূলক প্রচারণা চালিয়েছে। এমনকি এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমার বিরুদ্ধে ভুয়া ভিডিও ছড়ানো হয়েছে। একজন সাবেক টোরি এমপি শ্বেতাঙ্গ ও ‘নন-বাংলা ভাষাভাষী’ ভোটারদের আমার বিরুদ্ধে একজোট হয়ে ভোট দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছিলেন।”
তিনি আরও বলেন “যখন ইউরোপজুড়ে উগ্র ডানপন্থার উত্থান দেখা যাচ্ছে, তখন টাওয়ার হ্যামলেটস যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় ও সংহতিপূর্ণ এলাকার একটি হিসেবে আবারও প্রমাণ করেছে যে মানুষ বিভেদের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করেছে।
“২০২২ সালে অ্যাসপায়ার লেবার, কনজারভেটিভ ও লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের বাইরে প্রথম দল হিসেবে একটি লন্ডন বরো জয় করে। মানুষ লেবার ও টোরি কৃচ্ছ্রসাধনের বিকল্প চেয়েছিল, আর সেই পরিবর্তনের ঢেউ এখন পুরো লন্ডন ও যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক ভূমিকম্পে রূপ নিয়েছে।”
তিনি দাবি করেন, তাদের প্রশাসনই প্রথম কাউন্সিল হিসেবে সার্বজনীন ফ্রি স্কুল মিল চালু করেছে, টোরিদের বাতিল করা EMA পুনর্বহাল করেছে এবং লেবারের কর্তন করা Winter Fuel Payment ফিরিয়ে এনেছে।
লুৎফুর রহমান বলেন,“আমরা একসঙ্গে যা অর্জন করেছি, তা নিয়ে আমি গর্বিত। আশা করি আজ নির্বাচিত নতুন প্রগতিশীল প্রশাসনগুলোও আমাদের পথ অনুসরণ করবে এবং জনগণের জন্য বাস্তব পরিবর্তন আনতে একসঙ্গে কাজ করবে।”