এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংস্কার:
নতুন পুষ্টি মানে ফাইবার ও তাজা ফলের ওপর জোর; ব্রেকফাস্ট ক্লাবেও কড়াকড়ি। শিক্ষক নেতাদের উদ্বেগ বাস্তবায়নের বাজেট ও চাপ নিয়ে।
প্রতিবেদন: লন্ডন/ঢাকা: যুক্তরাজ্যের ইংল্যান্ডের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবারে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। সরকারি নীতি-নির্ধারকদের মতে, এটি গত এক দশকের মধ্যে দেশটির ‘স্কুল ডিনার’ বা স্কুল মিল ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় সংস্কার। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, স্কুলের খাবারের মেনুতে তাজা ফল, শাকসবজি এবং ফাইবারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হচ্ছে; বিপরীতে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে অতিরিক্ত তেলে ভাজা (ডিপ ফ্রায়েড) সব ধরনের খাবার।
শুধু দুপুরের খাবারই নয়, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডের স্কুলগুলোর ‘ব্রেকফাস্ট ক্লাব’গুলোকেও কঠোর পুষ্টি বিধিমালার আওতায় আনা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সুস্থ খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষ্যে নেওয়া এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে স্কুলগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি ও নিরীক্ষণ করা হবে।
কী ধরনের পরিবর্তন আসছে স্কুল মেনুতে?
নতুন ‘স্কুল ফুড স্ট্যান্ডার্ডস’ অনুযায়ী খাদ্যের গুণগত মান ও পুষ্টির ভারসাম্যে বড় ধরনের রদবদল আনা হয়েছে:
-
ডেজার্ট বা মিষ্টিজাতীয় খাবারে নিয়ন্ত্রণ: সেকেন্ডারি স্কুলে সপ্তাহে সর্বোচ্চ দুই দিন এবং প্রাইমারি স্কুলে সপ্তাহে মাত্র এক দিন কেক বা এ জাতীয় মিষ্টি ডেজার্ট পরিবেশন করা যাবে। তবে শর্ত হলো, মিষ্টি পদের সঙ্গে অবশ্যই এক পদ তাজা ফল পরিবেশন করতে হবে।
-
প্রসেসড মাংসে রাশ: হ্যাম, সসেজ কিংবা চিকেন নাগেটসের মতো অতি-প্রক্রিয়াজাত মাংসের পরিবেশন সপ্তাহে মাত্র এক দিনে সীমিত করা হয়েছে। এছাড়া এই খাবার দেওয়ার সময় পাতে আবশ্যিকভাবে ফল বা সবজির উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
-
ভাজার বদলে বেকিং: দীর্ঘদিনের পরিচিত ডিপ ফ্রায়েড চিপস পুরোপুরি বাতিল করে তার পরিবর্তে ওভেন-বেকড চিপস দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
-
ফাইবার ও হোলগ্রেইনের অন্তর্ভুক্তি: খাদ্যতালিকায় সপ্তাহে অন্তত একবার পরিবেশিত পাস্তার ন্যূনতম ৫০ শতাংশ হতে হবে ‘হোলহুইট’। এছাড়া সাধারণ রুটির পরিবর্তে হাই-ফাইবার বা লাল আটার রুটি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মূল নিয়মানুযায়ী, প্রতিটি খাবারের সঙ্গেই অন্তত এক পদ তাজা ফল অথবা সবজি থাকতে হবে।
ব্রেকফাস্ট ক্লাবেও কড়া নিয়ম
এতদিন পর্যন্ত ইংল্যান্ডের স্কুলগুলোতে পরিচালিত ব্রেকফাস্ট ক্লাবগুলোর মেনু নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নির্দেশনায় এই অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার অবসান ঘটছে।
নতুন নিয়মে পেস্ট্রি ও তেলে ভাজা ডিম (ফ্রায়েড এগ) মেনু থেকে বাদ পড়ছে। সিরিয়ালে চিনির পরিমাণে কঠোর সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় বাণিজ্যিক সিরিয়াল (যেমন: কোকো পপস) এবং চকোলেট স্প্রেড আর স্কুলে পরিবেশন করা যাবে না।
ইতিবাচক সাড়া বনাম বাস্তবায়নের বাস্তব চ্যালেঞ্জ
সরকারি পর্যায় থেকে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে দেশটির শিক্ষামন্ত্রী লুসি পাওয়েল এটিকে ‘এক প্রজন্মে একবার আসা সংস্কার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে স্কুলস মিনিস্টার জর্জিয়া গোল্ড জানিয়েছেন, বিদ্যমান বাজেটের সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখেই এই নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে এবং স্কুলগুলোকে নিয়ম অনুযায়ী খাপ খাইয়ে নিতে এক বছর সময় দেওয়া হবে।
তবে নীতিকে স্বাগত জানালেও এটি বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে স্কুল ও কলেজ নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন অব স্কুল অ্যান্ড কলেজ লিডার্স’ (ASCL)। সংগঠনের জেনারেল সেক্রেটারি পেপে ডি’ইয়াসিও সতর্ক করে বলেন, “স্কুলগুলো পুষ্টি বা খাদ্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান নয়। এই নতুন নিয়ম যাতে প্রধান শিক্ষকদের বিরুদ্ধে জবাবদিহিতার আরেকটি ‘লাঠি’ হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এটি সফল করতে হলে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা ও আর্থিক বিনিয়োগ প্রয়োজন।”
অন্যদিকে অভিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর এই সিদ্ধান্তের ইতিবাচক প্রভাবের কথা তুলে ধরেছেন শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকরা। বার্মিংহামের ওয়েসিস একাডেমি ব্লেকেনডেলের প্রিন্সিপাল ফারজানা আহমেদ জানান, ফ্রি স্কুল মিলের পরিধি বাড়ায় স্বল্প আয়ের বহু অভিভাবক আবেদন করছেন, যা শিশুদের স্কুলে উপস্থিতি ও মনোযোগ বাড়াতে সহায়ক হচ্ছে। কিনজা বাট নামের এক অভিভাবক স্বস্তি প্রকাশ করে জানান, পুষ্টিকর গরম খাবার নিশ্চিত হওয়ায় তাঁর সন্তানের আর প্রতিদিন ঠান্ডা স্যান্ডউইচের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না।
যুক্তরাজ্যের অন্যান্য অঞ্চলের চিত্র
এই নতুন মানদণ্ড কেবল ইংল্যান্ডের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রযোজ্য হবে। যুক্তরাজ্যভুক্ত অন্যান্য অঞ্চলের ক্ষেত্রে খাদ্য নীতিমালায় ভিন্নতা রয়েছে:
-
ওয়েলস: চলতি বছরের শেষ নাগাদ সেখানে নতুন নির্দেশনা কার্যকর হতে যাচ্ছে, যেখানে প্রতিদিনের পাতে অন্তত দুই পদ সবজি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
-
স্কটল্যান্ড: অঞ্চলটি আগেই সচেতন পদক্ষেপ নিয়ে ২০২০ সালে তাদের স্কুল খাদ্য নীতিমালা হালনাগাদ করেছে।
-
নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড: এখানে স্কুল মিল সংক্রান্ত সর্বশেষ সংস্কার হয়েছিল প্রায় দুই দশক আগে, ২০০৭ সালে।
বিশ্লেষকদের মতে, শৈশবেই স্থূলতা ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস প্রতিরোধে যুক্তরাজ্যের এই সংস্কার অত্যন্ত দূরদর্শী হলেও, খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি ও স্কুলের সীমিত বাজেটের মধ্যে পুষ্টিকর মেনু রক্ষা করা আগামী দিনগুলোতে প্রধান শিক্ষকদের জন্য বড় ধরনের ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।