Skip to main content

Brick Lane News

ব্রেক্সিট-পরবর্তী নতুন আইনি জটিলতা: যুক্তরাজ্যের ‘ভুল’ সিদ্ধান্তে অনিশ্চয়তায় হাজারো ইইউ নাগরিক

ব্রেক্সিট-পরবর্তী নতুন আইনি জটিলতা: যুক্তরাজ্যের ‘ভুল’ সিদ্ধান্তে অনিশ্চয়তায় হাজারো ইইউ নাগরিক

জুয়েল রাজ, প্রকাশক ও সম্পাদক, ব্রিকলেন নিউজ, লন্ডন :

যুক্তরাজ্যে বসবাসরত হাজার হাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নাগরিকের জীবনে আচমকা নেমে এসেছে অনিশ্চয়তার কালো ছায়া। ব্রেক্সিট-পরবর্তী সময়ে দেওয়া বসবাসের অধিকার বা ‘প্রি-সেটেলড স্ট্যাটাস’ (Pre-Settled Status) ভুলবশত প্রদান করা হয়েছিল—হোম অফিসের এমন এক দাবিতে চাকরি, বাসস্থান এবং ব্যাংকিং সেবাসহ মৌলিক অধিকার হারানোর শঙ্কায় পড়েছেন প্রবাসী ইইউ বাসিন্দারা। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, হোম অফিসের এই অবস্থান যুক্তরাজ্য ও ইইউ-এর মধ্যকার ঐতিহাসিক ‘প্রত্যাহার চুক্তি’ (Withdrawal Agreement) লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

আইনি ভুল নাকি প্রশাসনিক জটিলতা?

হোম অফিস থেকে ইতিমত্যেই অন্তত ১০০ জন ইইউ নাগরিকের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রয়োজনীয় নথিপত্র পর্যালোচনা না করেই অতীতে তাদের প্রি-সেটেলড স্ট্যাটাস মঞ্জুর করা হয়েছিল। ফলে তারা এখন যখন পাঁচ বছর মেয়াদ শেষে স্থায়ী ‘সেটেলড স্ট্যাটাস’-এর জন্য আবেদন করছেন, তখন তাদের পূর্বের বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ব্রেক্সিটের আগে যুক্তরাজ্যে পাঁচ বছরের কম সময় ধরে বসবাসকারী প্রায় ১৩ লাখ ইইউ নাগরিককে ‘ইইউ সেটেলমেন্ট স্কিম’-এর আওতায় প্রি-সেটেলড স্ট্যাটাস দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে শিশু, ইউরোপীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইএ) বহির্ভূত পরিবারের সদস্য এবং ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পর যুক্তরাজ্যে আসা ব্যক্তিদের ফাইলগুলো পুনরায় যাচাই-বাছাই বা রিভিউ করছে হোম অফিস।

একটি ঘটনার ব্যবচ্ছেদ: ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে (এনএইচএস) কর্মরত পর্তুগিজ নাগরিক ও পিএইচডি গবেষক গ্যাব্রিয়েলার গল্পটি এ সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্ট করে। হোম অফিসের চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, গ্যাব্রিয়েলা আবেদনের সময় নিজেকে ‘প্রাসঙ্গিক ইইএ নাগরিক’ প্রমাণের পর্যাপ্ত নথি দেননি। তবে এই দাবি পুরোপুরি নাকচ করে গ্যাব্রিয়েলা জানান, “আমি জন্মসূত্রে ইইউ নাগরিক এবং কোনো তথ্য গোপন করিনি। পাঁচ বছর যুক্তরাজ্যের সেবায় যুক্ত থাকার পর এখন এই প্রশাসনিক জটিলতায় আমার চাকরি, বাসস্থান এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন—সবকিছুই ঝুঁকির মুখে পড়েছে।”

নাগরিক অধিকার সংগঠনের ক্ষোভ ও আইনি সংকেত

অভিবাসী অধিকার রক্ষা সংক্রান্ত শীর্ষস্থানীয় সংগঠন ‘the3million’-এর তথ্য অনুযায়ী, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তথ্য অধিকার আইনের (FOI) বরাতে তারা জানায়, কেবল চলতি বছরের মার্চ মাসেই অন্তত ৯৫ জন নাগরিককে এ ধরনের নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী মনিক হকিন্স তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন,

“বহু মানুষ সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রেখে এখানে পরিবার গড়েছেন, সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন এবং স্থায়ী কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েছেন। বছরের পর বছর পর এসে হঠাৎ তাদের বৈধতা অস্বীকার করা সম্পূর্ণ অন্যায্য এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে চরম উদ্বেগজনক।”

অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য ও ইইউ-এর প্রত্যাহার চুক্তি পর্যবেক্ষণকারী স্বাধীন সংস্থা ইন্ডিপেনডেন্ট মনিটরিং অথরিটি (IMA) স্পষ্ট জানিয়েছে—হোম অফিসের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক দ্বিপক্ষীয় চুক্তির শর্তাবলীর সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে তারা ইতোমধ্যে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আনুষ্ঠানিক উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

হোম অফিসের বক্তব্য ও বিকল্প পথ

বিতর্কের মুখে হোম অফিস ব্যক্তিগত মামলার বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে অস্বীকার করলেও তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে। কর্তৃপক্ষের মতে:

  • যাদের প্রি-সেটেলড স্ট্যাটাস ভুলবশত অনুমোদিত হয়েছিল, তারা চাইলে বিকল্প অন্য অভিবাসন ক্যাটাগরিতে (Immigration Route) নতুন করে আবেদন করতে পারবেন।

  • কোনো আবেদনকারী যদি মনে করেন তার পূর্বের স্ট্যাটাস আইনিভাবেই সঠিক ছিল, তবে তিনি সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নতুন প্রমাণসহ আইনি আপিল (Legal Appeal) করার অধিকার রাখবেন।

সমাপনী বিশ্লেষণ

যেখানে একটি দেশের ওপর আস্থা রেখে হাজারো দক্ষ পেশাজীবী তাদের জীবন ও ভবিষ্যৎ উৎসর্গ করেছেন, সেখানে প্রশাসনিক ভুলের দায় সাধারণ নাগরিকদের ওপর চাপানো নীতিগতভাবে কতটা গ্রহণযোগ্য—তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আইনজ্ঞদের ধারণা, হোম অফিস যদি এই অবস্থান থেকে সরে না আসে, তবে বিষয়টি গড়াতে পারে উচ্চ আদালত কিংবা আন্তর্জাতিক বিচারিক মঞ্চ পর্যন্ত।