প্রতিবেদক: রুমা পাল
সূত্র: রয়টার্স
শ্রমিক অসন্তোষে নতুন করে অস্থিরতা, উৎপাদন বন্ধ ৬৭৯ কারখানায়
- মজুরি বোর্ড গঠনের পরও নতুন করে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
- ন্যূনতম মাসিক মজুরি দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানোর দাবি শ্রমিকদের।
- বিক্ষোভের জেরে ৬৭৯টি কারখানার কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।
ব্যাপক বন্ধের এক দিন পর সোমবার বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোতে সাময়িকভাবে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হলেও শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষের ঘটনায় শত শত কারখানায় আবারও উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।
এই অস্থিরতা বাংলাদেশ থেকে পোশাক রপ্তানির চালান বিলম্বিত হওয়া এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। বসন্ত ও গ্রীষ্ম মৌসুমের রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো। বাংলাদেশ থেকে এইচঅ্যান্ডএম, জারা, ওয়ালমার্ট ও প্রাইমার্কের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড পোশাক সংগ্রহ করে।
শ্রমিকেরা মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা (২৪৩ ডলার) করার দাবি জানাচ্ছেন। এই দাবিতে তাঁরা বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করেন, কারখানায় ভাঙচুর চালান এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান। এসব ঘটনায় ৬৭৯টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
চীনের পর বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। তৈরি পোশাক খাত দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেয়। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন এবং দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনে এই শিল্পের অবদান প্রায় ১০ শতাংশ।
শ্রমিকদের অসন্তোষ প্রশমিত করতে রোববার সরকার ছয় সদস্যের একটি মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
অব্যাহত সহিংসতা
পুলিশ জানিয়েছে, ঢাকায় সড়ক অবরোধের চেষ্টা করা শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়েছে। এ সময় বিক্ষোভকারীরা পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করেন।
রাজধানীর উপকণ্ঠে অবস্থিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ পোশাকশিল্প অঞ্চল আশুলিয়া ও গাজীপুরেও অস্থিরতার খবর পাওয়া গেছে।
পুলিশ ও শিল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীরা পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দিয়েছেন এবং কয়েকটি কারখানায় ভাঙচুর চালিয়েছেন।
রোববারের বিক্ষোভ ও কারখানা বন্ধের ঘটনার ধারাবাহিকতায় সোমবারও শ্রমিকেরা উচ্চতর মজুরি এবং কর্মসংস্থানসংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগের সমাধানের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখেন।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এবং মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আখতার বলেন,
“বিশ্বের যেসব দেশে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি সবচেয়ে কম, বাংলাদেশ তাদের অন্যতম।”
তিনি আরও বলেন, “কারখানার মালিকেরা যদি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি দিতে না পারেন, তাহলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে তাঁদের আরও ভালো দামের জন্য আলোচনা করা উচিত। শ্রমিকদের কম মজুরি দিয়ে কোনো ব্যবসা পরিচালনা করা যায় না।”
কারখানায় ভাঙচুর, উৎপাদন ব্যাহত
কারখানার মালিকেরা জানিয়েছেন, শিল্পটি বর্তমানে নানা ধরনের ব্যয় বৃদ্ধির মুখে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা এবং প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে চাহিদা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানিয়েছেন, বিক্ষোভের সময় প্রায় ২০ থেকে ২৫টি কারখানায় ভাঙচুর চালানো হয়েছে। এ ছাড়া চামড়াজাত পণ্য প্রস্তুতকারী একটি কারখানার কার্যালয়েও হামলা হয়েছে।
তিনি বলেন, “এভাবে পরিস্থিতি চলতে থাকলে এবং বারবার কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হলে আমাদের ‘কাজ নেই, মজুরি নেই’ নীতি কার্যকর করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “যারা শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে এবং শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবি যৌক্তিক। তাঁর মতে, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ভবিষ্যতে আরও শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিতে পারে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, উল্লেখযোগ্য হারে মজুরি বাড়ানো হলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে। এতে কারখানার মুনাফার পরিমাণ কমে যাওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মূল্য প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও দুর্বল হতে পারে।
তিনি বলেন, “শ্রমিকদের কল্যাণ এবং শিল্পের টেকসই উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে ধাপে ধাপে মজুরি সমন্বয়, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা জরুরি।”