Skip to main content

Brick Lane News

যুক্তরাজ্যের অখণ্ডতায় ফাটল: অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ও মার্কিন ‘হস্তক্ষেপের’ নতুন সমীকরণ

যুক্তরাজ্যের অখণ্ডতায় ফাটল: অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ও মার্কিন ‘হস্তক্ষেপের’ নতুন সমীকরণ

স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের নেতাদের স্বাধীনতাপন্থী অবস্থানের মাঝেই মার্কিন কংগ্রেসম্যানের ‘চার রাষ্ট্রের সমাধান’ প্রস্তাব যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।

লন্ডন/আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দীর্ঘদিনের অটুট রাজনৈতিক ইউনিয়ন গ্রেট ব্রিটেন বা যুক্তরাজ্য বর্তমানে এক নজিরবিহীন সাংবিধানিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটিকে ভেঙে চারটি পৃথক রাষ্ট্রে পরিণত করার পক্ষে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা। একই সময়ে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের শীর্ষ নেতারা যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে নিজেদের অধিকার আদায়ে একজোট হচ্ছেন। অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক—এই দ্বিমুখী চাপ যুক্তরাজ্যের ঐতিহাসিক অখণ্ডতাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

মার্কিন রাজনীতিবিদের ‘চার রাষ্ট্রের সমাধান’

যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সবচেয়ে বড় বিস্ময় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ফ্লোরিডার রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য র‍্যান্ডি ফাইনের সাম্প্রতিক মন্তব্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং আয়ারল্যান্ড দ্বীপের পুনরেকত্রীকরণের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ‘চার রাষ্ট্রের সমাধান’ (Four-State Solution)-এর প্রস্তাব দিয়েছেন।

মার্কিন রাজনীতিকদের এমন মন্তব্য এখানেই সীমাবদ্ধ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সম্প্রতি আয়ারল্যান্ডের পুনরেকত্রীকরণের বিষয়ে প্রকাশ্যে তার ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। আয়ারল্যান্ড সফরকালে তিনি মন্তব্য করেন, এমনটি ঘটলে তিনি খুশি হবেন এবং অদূর ভবিষ্যতে এটি ঘটবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

তবে র‍্যান্ডি ফাইনের মন্তব্যের পেছনে কূটনৈতিক অসন্তোষও কাজ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে ব্রিটিশ সরকারের ইসরায়েল নীতির কড়া সমালোচনা করেছিলেন তিনি। এমনকি এক পর্যায়ে ব্রিটেনকে কটাক্ষ করে ‘ইউনাইটেড ইসলামিক কিংডম’ আখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি ফ্লোরিডায় ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন এই কংগ্রেস সদস্য।

কার্ডিফ সম্মেলন: তিন অঞ্চলের ঐক্যবদ্ধ চাপ

মার্কিন উসকানিমূলক এসব মন্তব্যের মধ্যেই যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। স্কটল্যান্ডের নেতা জন সুইনি, ওয়েলসের রুন আপ আইওরওয়েথ এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের মিশেল ও’নিল সোমবার কার্ডিফে এক ঐতিহাসিক বৈঠকে মিলিত হতে যাচ্ছেন।

এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য হলো লন্ডনের কেন্দ্রীয় সরকার বা ওয়েস্টমিনস্টারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা। ধারণা করা হচ্ছে, তারা একটি যৌথ ঘোষণার মাধ্যমে নিজ নিজ দেশের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গণভোটের আইনি অধিকার সরাসরি দাবি করবেন।

সাংবিধানিক ও আইনি প্রেক্ষাপট

যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের স্বাধীনতার দাবি নতুন নয়, তবে এর আইনি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বেশ জটিল:

গুড ফ্রাইডে চুক্তি ১৯৯৮

উত্তর আয়ারল্যান্ডে দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির আওতায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আয়ারল্যান্ডের পুনরেকত্রীকরণের প্রশ্নে গণভোট (বর্ডার পোল) আয়োজনের সুযোগ রাখা হয়েছে।

স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা গণভোট ২০১৪

ঐতিহাসিক এই গণভোটে স্কটল্যান্ডের ৫৫ শতাংশ ভোটার যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থাকার পক্ষে এবং ৪৫ শতাংশ স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দেন।

সুপ্রিম কোর্টের রায় ২০২২

যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট রুলিং জারি করে যে, ওয়েস্টমিনস্টারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া স্কটিশ পার্লামেন্ট একতরফাভাবে নতুন কোনো স্বাধীনতা গণভোটের আয়োজন করতে পারবে না।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের কারণে স্কটল্যান্ডের আইনি পথ সীমিত হলেও রাজনৈতিক প্রচার থেমে নেই। ওয়েলসেও স্বাধীনতার দাবি ক্রমশ জোরদার হচ্ছে, যার নেতৃত্বে রয়েছে রাজনৈতিক দল প্লেইড কামরি।

অর্থনীতি বনাম রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর

রাজনৈতিক এই উত্তেজনার বিপরীতে অর্থনৈতিক বাস্তবতা বেশ ভিন্ন। রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও মার্কিন কংগ্রেসম্যানের হুমকির মুখেও, ফ্লোরিডায় যুক্তরাজ্যের বিনিয়োগের পরিমাণ বিশাল। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ফ্লোরিডার সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী হলো যুক্তরাজ্য এবং ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো সেখানে প্রায় ৮৮ হাজার কর্মসংস্থানের জোগান দেয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর বাস্তবে রূপ নিলে তা আটলান্টিকের দুই পারের বাণিজ্য ও অর্থনীতিতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সারসংক্ষেপ: যুক্তরাজ্যের ভেতরে থাকা স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের প্রবল আকাঙ্ক্ষা এবং আটলান্টিকের ওপার থেকে আসা অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক সমর্থন—সব মিলিয়ে ওয়েস্টমিনস্টারের সামনে এখন এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। তিন অঞ্চলের নেতাদের কার্ডিফ বৈঠক এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাজ্যের মানচিত্র ও অখণ্ডতার ক্ষেত্রে কী পরিবর্তন আনে, তা-ই এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মূল পর্যবেক্ষণের বিষয়।