Skip to main content

Brick Lane News

৫৪ বছর বয়সে এসএসসি পাস করে দৃষ্টান্ত গড়লেন নাটোরের আলী আকবর

৫৪ বছর বয়সে এসএসসি পাস করে দৃষ্টান্ত গড়লেন নাটোরের আলী আকবর

প্রতিবেদক: ব্রিকলেন নিউজ , ঢাকা :

প্রবাদ আছে, ‘ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়।’ লক্ষ্য যদি অটুট থাকে, তবে বয়স বা পারিপার্শ্বিক কোনো বাধাই যে স্বপ্ন পূরণের পথে অন্তরায় হতে পারে না, তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নাটোরের বাগাতিপাড়ার বাসিন্দা আলী আকবর। জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে, ৫৪ বছর বয়সে এসে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তিনি জিপিএ-৪ দশমিক ৩৫ পেয়ে সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাঁর এই অদম্য ইচ্ছাশক্তি আজ সমাজের সব স্তরের মানুষের জন্য এক উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা।

দারিদ্র্যের কশাঘাত এবং থমকে যাওয়া শিক্ষাজীবন:

আলী আকবর (ডাকনাম আলী আজম) বাগাতিপাড়া পৌরসভার পেড়াবাড়িয়া মহল্লার মোল্লা শেখ খোকার ছেলে। ছয় ভাই ও পাঁচ বোনের বৃহৎ পরিবারে অভাব-অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী। পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান হিসেবে খুব ছোটবেলাতেই তাঁকে বই-খাতা ছেড়ে উপার্জনের পথে নামতে হয়। বাবার সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে পরিবারের হাল ধরতে গিয়ে নিজের পড়াশোনার স্বপ্নকে সেদিন বিসর্জন দিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীতে সংসার জীবনে প্রবেশ করার পর সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে গিয়ে তাঁকে নতুন করে কঠিন সংগ্রামের মুখোমুখি হতে হয়।

সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করার লড়াই:

জীবিকার তাগিদে একপর্যায়ে স্ত্রীসহ রাজশাহীর ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে চাকরি নেন আলী আকবর। নিজেদের স্বপ্ন ও শখগুলোকে একপাশে সরিয়ে রেখে স্বামী-স্ত্রীর উপার্জিত সবটুকু অর্থ তাঁরা বিনিয়োগ করেন সন্তানদের শিক্ষার পেছনে। তাঁদের সেই আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। বড় মেয়ে আজ পেশায় একজন নার্স এবং ছোট ছেলে এমবিবিএস চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত।

দীর্ঘ বিরতির পর পুনরায় বই হাতে নেওয়া:

সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করার পর জীবনের এই পর্যায়ে এসে আলী আকবর অনুভব করেন তাঁর সেই ফেলে আসা স্বপ্নের কথা। চাকরির সুবাদে রাজশাহীতে অবস্থান করায় নওহাটা সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি হাই স্কুলের কারিগরি শাখা থেকে তিনি এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

সাফল্যের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আলী আকবর বলেন, “সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করেছি, তাদের বিয়ে-শাদি দিয়েছি। এখন স্ত্রীসহ আমরা বিগত দিনের দুঃখ-কষ্ট ভুলে সুখে সংসার করছি। জীবনের শেষ সময়ে এসে আবারও পড়াশোনা করার ইচ্ছা জাগে। ঘরে বসে না থেকে পড়াশোনা শুরু করি এবং আলহামদুলিল্লাহ, ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় প্রথমবারেই কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছি।”

নতুন প্রজন্মের প্রতি বার্তা:

বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর উপদেশ অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি বলেন, “পড়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট বয়স লাগে না। পরীক্ষায় ভালো ফল করতে প্রয়োজন প্রবল মনোবল ও মনোযোগ। অযথা মোবাইল গেম খেলে বা আড্ডায় সময় নষ্ট না করে পড়াশোনায় মনোযোগী হলে যে কেউ কৃতিত্ব অর্জন করতে পারে। আমি নিজেই তার প্রমাণ।”

পারিবারিক সমর্থন ও আগামীর লক্ষ্য:

বাবার এই সাফল্যে উচ্ছ্বসিত তাঁর ছেলে চিকিৎসক ইসমাইল হোসেন। তিনি বলেন, “বাবা মাঝে মাঝেই বলতেন, তাঁর পড়াশোনার খুব ইচ্ছা ছিল। কিন্তু পারিবারিক অভাব এবং আমাদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছিলেন। আজ আমরা প্রতিষ্ঠিত। আমার স্ত্রীও একজন ডাক্তার, বড় বোন নার্সিং পেশায় আছেন এবং বোনজামাই একজন শিক্ষক।”

ইসমাইল হোসেন আরও জানান, বাবার শিক্ষিত হওয়ার সুপ্ত ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে তাঁরাই তাঁকে স্কুলে ভর্তি করেছিলেন। এসএসসি পাসের পর এবার বাবাকে উচ্চমাধ্যমিকে (এইচএসসি) ভর্তি করানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা। বাবার এই নতুন যাত্রার জন্য তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন।

আলী আকবরের এই সাফল্য কেবল একটি সার্টিফিকেট অর্জনের গল্প নয়; এটি হার না মানা মানসিকতা এবং শিক্ষার প্রতি চিরন্তন অনুরাগের এক অসাধারণ আখ্যান। তাঁর এই যাত্রা প্রমাণ করে, স্বপ্ন দেখার এবং তা পূরণের জন্য কখনো দেরি হয়ে যায় না।