
সাইফুর রহমান-
দেশের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ তুলনামূলকভাবে আড়ালেই থেকে গেছে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত দুটি ভাসমান এলএনজি (FSRU) টার্মিনালের একটিতে ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ড ও বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
আরেকটি সংবাদ হলো, রাজধানীর মেট্রোরেল লাইন-৫ (নর্দান রুট) প্রকল্পের উড়াল অংশ নির্মাণে চীনের তিন প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগকে কাজ দেওয়ার প্রস্তাব শেষ মুহূর্তে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কেন এই প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়েছে জানেন? অর্থের অভাবে। বাংলাদেশে এমন ঘটনা এর আগে শুনেছেন? আচ্ছা, এই দুটি সংবাদ মনে রাখুন।
মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত এই টার্মিনালে প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট বা বয়লার বিস্ফোরণের কারণে আগুন লাগে বলে জানা যায়। এতে গুরুত্বপূর্ণ ক্যাবল, কন্ট্রোল প্যানেল এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্ঘটনার পর থেকেই টার্মিনালটি থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ফলে শিল্পকারখানা ও আবাসিক খাতে গ্যাস সংকট প্রকট হয়ে ওঠে।
উল্লেখ্য, মার্কিন জ্বালানি প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি ২০১৮ সালের ১৮ আগস্ট থেকে মহেশখালীর এই ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনা করে আসছে। এদিকে, ২০২৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটিতে যোগ দেন সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস। ‘মায়ের ডাক’-এর তুলিকে এক ভিডিওতে বলতে দেখা যায়, জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন পিটার হাস।
সম্প্রতি সরকারি দল ও বিরোধী দলের কুসুম কুসুম বিরোধিতার নাটকের আড়ালে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। সরকার অনুমোদন দিয়েছে যে আগামী ১৩ বছর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গানভর ইউএসএ এলএলসি থেকে দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি আমদানি করা হবে। প্রতিষ্ঠানটির সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রে হলেও এর মূল (প্যারেন্ট) কোম্পানি সুইজারল্যান্ডের জেনেভাভিত্তিক। চুক্তি অনুযায়ী, গানভর প্রতি বছর ৬টি করে মোট ৭৮টি এলএনজি কার্গো বাংলাদেশে সরবরাহ করবে। বর্তমান বাজারমূল্যের ভিত্তিতে এই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ৭১,৪৯৫ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকা।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাধারণত সরকার-টু-সরকার (G2G) চুক্তি সংশ্লিষ্ট দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পাদিত হয়। কিন্তু গানভর ইউএসএ এলএলসি একটি বেসরকারি মার্কিন ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান।
এবার একটু পেছনে তাকাই। ২০২৫ সালের ২১ থেকে ২৪ জানুয়ারি ড. মুহাম্মদ ইউনূস সুইজারল্যান্ড সফর করেন। ওই সফরে তিনি ডিপি ওয়ার্ল্ড (DP World)-এর চেয়ারম্যান সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েম এবং রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালের চেয়ারম্যান আমের আলিরেজার সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। আন্তর্জাতিক বন্দর ও লজিস্টিকস খাতে ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং গানভর দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। গানভরের বিপুল পরিমাণ খনিজ তেল ও এলএনজির পরিবহন, সংরক্ষণ এবং বন্দর ব্যবস্থাপনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের টার্মিনালগুলো বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
এটিও উল্লেখযোগ্য যে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপে, বিশেষ করে জার্মানি ও ফিনল্যান্ডের, এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থায় গানভর গ্রুপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ইউরোপের জ্বালানি অবকাঠামো ও গ্যাস নিরাপত্তার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির বিস্তৃত বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে।
একদিকে মেট্রোরেল প্রকল্পের লাইন-৫ এর উড়াল অংশ নির্মাণ বন্ধ হয় অর্থাভাবে, অপরদিকে ৫০% বেশি দামে মার্কিন প্রতিষ্ঠান থেকে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছে সরকার। সাথে আছে দুই ডজন বোয়িং। গমসহ বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলারের কৃষি পণ্য কিনতে হবে। কিনতে হবে ডেইরি ও পোল্ট্রি সামগ্রীও। লেখার শুরুতে উল্লেখিত দুটি সংবাদের মর্ম কি কিছুটা বোধগম্য হচ্ছে? তীব্র গ্যাসের সংকট সৃষ্টি করে, চড়া মূল্যে তা কিনতে বাধ্য করা—এসবই হলো বিএনপি-জামায়াতের সম্মতিতে করা ইউনূসের জাদুর সেই মার্কিন গোলামীর চুক্তির ফল।
দেশ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে বিএনপি মার্কিন গোলামির চুক্তির সবকিছু জনগণের সামনে উপস্থাপন করত। কেন, কোন চাপে এবং কী পরিস্থিতিতে তারা এই চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছে, সেটিও স্পষ্ট করত।
নতুবা দেশের বর্তমান এই ভয়াবহ পরিস্থিতির পুরো দায় শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের ওপর চাপিয়ে পার পাওয়া যাবে না। কারণ, চব্বিশের আগস্টের পর প্রায় দুই বছর কেটে গেছে। যদি এর দায় আওয়ামী লীগেরই হতো, তাহলে এই সংকট আরও আগেই স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হতো। মনে করে দেখুন, ইউনুসের অর্থ উপদেষ্টা ও তার নিয়োগকৃত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ক্ষমতা নেয়ার পরে বলেছিল, অর্থনীতির অবস্থা অতটা খারাপ নয় যতটা বাইরে থেকে শোনা যায়।
এর মধ্যে একজন আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় প্রায় ১৮ মাস দেশ পরিচালনা করেছেন এবং দুর্নীতির ক্ষেত্রে অতীতের বহু রেকর্ড ভেঙেছেন। অথচ পুরো সময়জুড়ে কার্যকর সমাধানের পরিবর্তে কেবল কথার ফুলঝুরি ছড়ানো হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, মহেশখালীর টার্মিনালে দুর্ঘটনা, পরবর্তী গ্যাস সংকট এবং এর অল্প সময়ের মধ্যেই দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানির নতুন চুক্তি—এই ঘটনাগুলোকে কি কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা উচিত, নাকি বৃহত্তর জ্বালানি ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন? ভাবুন, যদি মগজে সামান্যতম কিছু থেকে থাকে। নতুবা, স্লোগান দিন ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’।