চট্টগ্রাম/কক্সবাজার: বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে টানা চার দিনের অতি ভারী বর্ষণে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পাহাড় ধস, দেয়াল ধস এবং আকস্মিক বন্যায় গত তিন দিনে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং রাঙামাটিতে অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে বুধবার (৮ জুলাই) নিহত সাতজনের মধ্যে পাঁচজনই শিশু।
টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরীতে দ্বিতীয় দিনের মতো তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে, যার ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি, রেললাইন বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে সব ধরনের ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে।
পাহাড় ধস ও দেয়াল ধসে ২২ প্রাণহানি গত তিন দিনে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসে অন্তত ২২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে বুধবার (৮ জুলাই) কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প নম্বর ৫-এ একটি পাহাড়ের ঢালে থাকা নারী হিফজ মাদ্রাসার দেয়াল ধসে ৫ ছাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।
১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) কমান্ডিং অফিসার সিরাজ আমিন জানান, নিহতরা হলো—রাশিদা বেগম (১৩), উম্মে নেজাতুল (১৩), উম্মে সালমা (১২) এবং উমাইসা বিবি (১৩)। অপর একজনের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দুর্ঘটনার সময় ওই মাদ্রাসায় প্রায় ৩০ জন শিশু ছিল। ফায়ার সার্ভিস, এপিবিএন এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় বাকিদের উদ্ধার করা হয়। গুরুতর আহত ৩ ছাত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এছাড়া, বুধবার সকালে চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে পাহাড় ধসে ১০ মাস বয়সী শিশু আশরাফুল ইসলাম নিহত এবং তার মা লামিয়া আক্তার আহত হন। বিকেলে চশমা হিল এলাকায় অপর এক পাহাড় ধসে সামিয়া ইসলাম (১৩) নামের আরও এক কিশোরীর মৃত্যু হয়। এর আগে, রবিবার রাতে কক্সবাজারে ১০ জন এবং মঙ্গলবার তিন জেলায় পাহাড় ধসে আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
কক্সবাজারের উখিয়ায় নারী মাদ্রাসার দেয়াল ধসে পাঁচ ছাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে, চলছে উদ্ধারকাজ। ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম নগরীতে অবর্ণনীয় জলাবদ্ধতা লঘুচাপের প্রভাবে বুধবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৭৯.৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের দিন মঙ্গলবার ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়, যা গত ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এই নজিরবিহীন বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম নগরীর কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা, চকবাজার, রিয়াজউদ্দিন বাজার, আগ্রাবাদ, হালিশহরসহ বিভিন্ন এলাকা ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে ছিল। নিচতলার বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ায় মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েন। আগ্রাবাদের রেস্তোরাঁ মালিক মোহাম্মদ রাশেদ বলেন, “নর্দমা ও খালগুলো ঠিকমতো পরিষ্কার না করায় এবার জলাবদ্ধতা আগের চেয়ে অনেক বেশি। ব্যবসা-বাণিজ্য একেবারেই বন্ধ।”

কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ টানা বর্ষণে চট্টগ্রামের সুন্নিয়া মাদ্রাসা ও শমসেরপাড়া অংশে প্রায় চার কিলোমিটার রেললাইন দুই ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে বুধবার থেকে ট্রেন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
রেলপথ উপদেষ্টা হাবিবুর রশীদ বুধবার সকালে ওই এলাকা পরিদর্শন করে জানান, ভবিষ্যতে এ ধরনের বন্যা প্রতিরোধে ওই এলাকার রেলওয়ে এমব্যাংকমেন্ট আরও পাঁচ ফুট উঁচু করা হবে। তবে বাংলাদেশ রেলওয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা আনিসুর রহমান জানিয়েছেন, পানি না নামা পর্যন্ত ট্রেন চলাচল কখন স্বাভাবিক হবে তা বলা সম্ভব নয়। ট্রেন যাত্রা বাতিল হওয়ায় অনেক যাত্রীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
সাজেকে আটকা ৪৫০ পর্যটক, ৫ জেলায় বন্যা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা-সাজেক সড়কের বিভিন্ন অংশ তলিয়ে যাওয়ায় রাঙামাটির সাজেকে প্রায় ৪৫০ জন পর্যটক আটকা পড়েছেন। আবহাওয়া পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসন মঙ্গলবার থেকেই সাজেকে পর্যটকদের যাতায়াতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
সাজেক কটেজ ও রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুপর্ণা দেব বর্মা জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সেনাবাহিনীর সহায়তায় আটকে পড়া পর্যটকদের খাগড়াছড়ি শহরে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। এদিকে, চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের সব ঝরনায় পর্যটকদের প্রবেশ শুক্রবার পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে বন বিভাগ।
টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরীতে অন্তত ১৫ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং ফসলি জমি ও মাছের ঘেরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মত: সমন্বয়ের অভাব ও বৃষ্টির তীব্রতা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক অলোক পাল বলেন, আষাঢ় মাসের প্রথম ২০ দিন তেমন বৃষ্টি না হওয়ার পর লঘুচাপের কারণে একসঙ্গে এতো বৃষ্টি হওয়ায় এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি দুর্যোগ মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ের অভাবের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, “বর্ষা মৌসুমের শুরুতে প্রশাসন যথাযথ প্রস্তুতি নিতে প্রায়ই ব্যর্থ হয়। শুরু থেকে ভালো সমন্বয় থাকলে এতো মানুষের প্রাণহানি হয়তো এড়ানো যেত।” তবে আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রহমান খান বলেন, বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ সৃষ্টি হলে এমন ভারী বৃষ্টিপাত স্বাভাবিক এবং পূর্বাভাসে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল।
আগামী আরও দুই দিন এই বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস।