ঢাকা: আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে বলে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলে হাইকোর্টের দেওয়া ঐতিহাসিক রায় বহাল রাখার পরপরই সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এই কথা জানান। এই সংশোধনীর মাধ্যমেই মূলত দেশে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল।
‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিএনপির আন্দোলনের ফসল’ রায় ঘোষণার পর সচিবালয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন আইনমন্ত্রী। এ সময় আগামী জাতীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে কি না—একজন সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে মো. আসাদুজ্জামান দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, “ইনশাআল্লাহ। এটি আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিএনপির আন্দোলনের ফসল।”
তাঁর এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিতর্কের আনুষ্ঠানিক অবসান হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অ্যাটর্নি জেনারেলের ব্যাখ্যা ও হাইকোর্টের রায় বহাল এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলগুলো খারিজ করে দেন।
রায়ের পরপরই অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, “হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে যেসব আপিল করা হয়েছিল, আপিল বিভাগ আজ তা খারিজ করে দিয়েছেন। এর অর্থ হলো, পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায়টিই চূড়ান্তভাবে বহাল রইল।”
তিনি আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, “পঞ্চদশ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে যখন রিট দায়ের করা হয়েছিল, তখন হাইকোর্ট প্রধানত চারটি বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও গণভোট ফিরিয়ে আনা এবং ৭ক ও ৭খ অনুচ্ছেদ বাতিলের রায় বহাল রাখা। আপিল বিভাগের আজকের আদেশের ফলে হাইকোর্টের সেই রায়ই টিকে রইল।”
পঞ্চদশ সংশোধনীর প্রেক্ষাপট ও আইনি লড়াই ২০১১ সালের ৩০ জুন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে। এর মাধ্যমে সংবিধানে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়, যার মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত ছিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা।
এছাড়া এই সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা বেআইনিভাবে দখলের সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ, শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান এবং রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, এই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে দুটি পৃথক রিট দায়ের করা হয়। ওই বছরের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট চূড়ান্ত রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ নম্বর ধারা (যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট বাতিল করা হয়েছিল) বাতিল ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে সংবিধানে যুক্ত হওয়া ৭ক, ৭খ ও ৪৪(২) অনুচ্ছেদও অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে বাতিল করা হয়।
গত বছরের (২০২৫ সালের) ৮ জুলাই হাইকোর্টের এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়। পরে এই রায়ের বিরুদ্ধে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ বিশিষ্ট নাগরিকরা লিভ-টু-আপিল দায়ের করলে ১৩ নভেম্বর তা মঞ্জুর করেন আপিল বিভাগ। এরপর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে মোট তিনটি পৃথক আপিল দায়ের করা হয়েছিল, যার সবকটিই আজ বৃহস্পতিবার আপিল বিভাগে খারিজ হয়ে গেল।