হামে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার খরচ মেটাতে অনেক পরিবারের হিমশিম অবস্থা। অনেকে খরচের চাপ সামলাতে না পেরে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করান, খরচ কম হলেও পান না পর্যাপ্ত সরঞ্জাম। আবার অনেক পরিবার খরচ বেশি হলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে যান। কিন্তু সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের গড় খরচ কত, সে বিষয়ে কোনো গবেষণার খোঁজ না মিললেও বিরাট তফাতের এক তথ্য উঠে এসেছে জরিপে।
হামে আক্রান্ত রোগীদের ওপর অর্থনৈতিক প্রভাব যাচাই করতে রাজধানীর ডিএনসিসি হাসপাতাল ও বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে ভর্তি ২০ জন রোগীর তথ্য নিয়ে জরিপ চালায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
সংস্থাটি জরিপে বলছে, গত ৭ থেকে ১১ মে পর্যন্ত এই জরিপ পরিচালনা করা হয়। এতে দেখা যায়, ডিএনসিসির মতো সরকারি হাসপাতালে ছয় দিনের চিকিৎসায় রোগীপ্রতি গড় ব্যয় ১২ হাজার ৬৭০ টাকা। আর শিশু হাসপাতালের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে একই সময়ের খরচ ২৯ হাজার ৬০০ টাকা, যা সরকারি হাসপাতালের চেয়ে প্রায় আড়াই গুণ বেশি।
চলতি বছর দেশে হামের প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত ৬২ হাজার ৭৬৭ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। শুধু সরকারি হাসপাতালের হিসাব ধরলেও রোগীদের পকেট থেকে খরচ হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। বেসরকারি হাসপাতাল এবং রাজধানীতে আসার আগে স্থানীয় পর্যায়ে করা খরচ যোগ করলে মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় শতকোটি টাকারও বেশি।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত খরচ আরও অন্তত দুই থেকে তিন গুণ বেশি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ১৮ মে পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৬২ হাজার ৭৬৭ জন, যাদের প্রায় সবাই ভর্তি ছিলেন। এই সংখ্যার বিপরীতে সরকারি হাসপাতালের গড় ব্যয়ের হিসাব করলে মোট খরচ দাঁড়ায় ৭৯ কোটি ৫২ লাখ ৫৭ হাজার ৮৯০ টাকা। বেসরকারি হাসপাতালের ব্যয় ও অন্যান্য খরচ যোগ করলে ব্যয়ের পরিমাণ ১০০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে।
সাধারণ শয্যার পাশাপাশি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রেও (আইসিইউ) খরচের ব্যবধান আকাশ-পাতাল। ডিএনসিসি হাসপাতালের আইসিইউতে দৈনিক খরচ প্রায় দুই হাজার ২০০ টাকা। অথচ শিশু হাসপাতালের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এই খরচ ১২ হাজার টাকারও বেশি।
ডিএনসিসি হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আসিফ হায়দার বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে ৯০ শতাংশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা সরকারি খরচে করা হচ্ছে। এ ছাড়া আইজিএমের মতো বিশেষ পরীক্ষাগুলো আইপিএইচের মাধ্যমে বিনামূল্যে করানো হচ্ছে। অতি উচ্চমূল্যের অ্যান্টিবায়োটিক (যেমন মেরোপেনেম বা ভ্যাঙ্কোমাইসিন) কিনতে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার টাকা খরচ হতে পারে, তা সরকার থেকে বিনামূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে। শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে প্রোটিনযুক্ত খাবার, ডিম এবং গুরুতর অসুস্থদের জন্য বিশেষ খাবার দেওয়া হচ্ছে।’
ভোলার লালমোহন উপজেলার তাহসিন (৫) এক সপ্তাহ ধরে ডিএনসিসি হাসপাতালে হামের চিকিৎসা নিচ্ছে। শুরুতে জ্বর ও ডায়রিয়া দেখা দিলে তাকে জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার ১০ দিনের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসকরা ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। এরপর বেসরকারি শিকদার মেডিকেলে কিছুদিন থাকার পর ১২ মে ভর্তি হয় ডিএনসিসিতে।
তাহসিনের বাবা রবিউল ইসলাম পেশায় একজন জেলে। সোমবার (১৮ মে) হাসপাতালের সিঁড়িতে তিনি বলেন, ‘এখানে আসার আগে অন্য হাসপাতালে ভর্তি থাকায় অবস্থায় যে হারে খরচ গেছে, সে তুলনায় এখানে (ডিএনসিসি হাসপাতাল) খরচ অনেক কম। খরচের মধ্যে ভর্তি ২৩০ টাকা, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অক্সিজেন মাস্ক, স্যালাইন দেওয়ার বিশেষ পাইপ, নেবুলাইজার মেশিন, একজন মানুষের খাওয়া (হাসপাতাল থেকে দেওয়া ছেলের খাবার মা খান) সব মিলিয়ে গত এক সপ্তাহে আড়াই হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে।’
৯ মে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয় চার মাসের শিশু জুবায়ের আহমেদ। পাঁচ দিন পর সুস্থ হয়ে গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলে ফিরে যায়। এই পাঁচ দিনে বেড ভাড়া, অ্যাটেনডেন্স খরচ, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং দুজনের খাবার মিলিয়ে পরিবারকে গুনতে হয়েছে ২২ হাজার ৫০০ টাকা।
শিশু হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম বলেন, খরচ কতটা হবে তা রোগীর অবস্থার ওপর নির্ভর করে। ডিএনসিসি হাসপাতালের তুলনায় শিশু হাসপাতালে ক্রিটিক্যাল রোগীরা বেশি আসে। ফলে এখানে ব্যয় একটু বেশি। তারপরও আমরা যতটুকু সম্ভব কম রাখার চেষ্টা করি, অনেক রোগীকে বিনামূল্যেও সেবা দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, সরকার থেকে আমরা ২৮ থেকে ৩০ কোটি টাকা সহায়তা পাই। কিন্তু একেকজন রোগীর পেছনে ব্যয় অনেক বেশি। রোগীদের জন্য এটি বোঝা। কিন্তু এসব সংকট মোকাবিলা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে দেশের বিত্তশালী, ক্রিকেটার, বড় বড় বেসরকারি হাসপাতালের মালিকদের এগিয়ে আসতে হবে।
ডিএনসিসিতে ভর্তি রোগীদের প্রায় ৯০ শতাংশই একাধিক হাসপাতাল ঘুরে এসেছেন। নিজ জেলা থেকে শুরু করে ঢাকার বেসরকারি হাসপাতাল পর্যন্ত পথে পরিবহন ও চিকিৎসার পেছনে যে খরচ হয়, তা হিসাব করলে রোগীদের প্রকৃত ব্যয় অনেক বেশি হবে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ।
তিনি বলেন, হামের উপসর্গ দেখা দিলে কোনো রোগী স্থানীয় ফার্মেসিতে গেছে, এরপর উপজেলা অথবা জেলা হাসপাতালে। সেখানে অবস্থা গুরুতর দেখে ঢাকায় পাঠিয়েছে। অধিকাংশ রোগী আবার ঢাকায় কোনো হাসপাতাল ঘুরে সরকারি বড় হাসপাতালে গেছে। তার মানে শেষ হাসপাতালে যে ব্যয়, সেটাই চূড়ান্ত নয়। তার আগে দুই থেকে তিনগুণ অর্থ তাকে ব্যয় করতে হয়েছে। সরকার ভ্যাকসিন দিচ্ছে। কিন্তু চিকিৎসায় সরকারের ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি রয়েছে।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল হামের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়। যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলা করতে সরকারের সব বিভাগের সমন্বয় ও সম্পৃক্ততা দরকার। সরকার সচেষ্ট হলে ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিত। করোনা মহামারিতে আমরা সরকারকে শক্তভাবে শুধু মাস্ক কেনার জন্য বিশেষ বরাদ্দ দিতে বলেছিলাম। কিন্তু এবার কিছুই বলা যাচ্ছে না। শুধু টিকা দেওয়া নিয়ে কথা হচ্ছে। কিন্তু হামে যেসব শিশু মারা গেছে তাদের বড় অংশই অব্যবস্থাপনার বলি হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘সরকার চরম অবহেলা করছে। আমরা ফ্যামিলি কার্ড দিচ্ছি, আর এই দুর্যোগের জন্য একটা মাস্ক কিনতে পারি না? শুধু টিকা নিয়েই পড়ে থাকলাম, আসলে টিকা দিলেই শুধু শেষ নয়। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, সরকার হাত-পা গুটিয়ে বসে রয়েছে। টিকা কিনে দিলেই শেষ নয়। এখনও দোষারোপের ওপর চলছে সবকিছু।’
বিদ্যমান সংকট থেকে উত্তরণে জরুরি তহবিল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ। তিনি বলেন, ‘রোগীর স্বজন মা-বাবার খাবারের খরচ বাদে চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট কিছু যাতে রোগীকে বাইরে থেকে কিনতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে সরকার বাধ্য। এ জন্য হাসপাতালগুলোকে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া দরকার। এতে করে অর্থের অভাবে কোনো সেবা দিতে সমস্যা হলে তা দিয়ে কিনতে পারবে হাসপাতালগুলো।’
তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে জরুরি দুর্যোগ মোকাবিলায় জরুরি তহবিল গঠন। সরকার থেকে শুরু করে দেশের বিত্তশালীরা এমনকি চিকিৎসকরাও এতে অর্থ সহায়তা দেবেন। এতে সরকারের আন্তরিকতা আরও বেশি প্রকাশ পাবে। যারা ভ্যাকসিন পেয়েছে তারা ক্ষতি থেকে হয়তো রক্ষা পাবে। কিন্তু যারা ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, হচ্ছে, তাদের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।’
১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামে ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৪৬৪ জনের। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৭৫ জন, বাকিরা উপসর্গ নিয়ে। জরিপে দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে কেবল ৫৫ শতাংশ এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং পেয়েছে। ২০ শতাংশ পেয়েছে কম, আর ২৫ শতাংশ মায়ের বুকের দুধই পায়নি।
গত ১৭ মে প্রেস ক্লাবে এক সেমিনারে এ নিয়ে কথা বলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে গিয়ে দেখেছি, হামে আক্রান্ত শিশুদের মায়েদের শরীরে পুষ্টির ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এসব মায়েরা শিশুদের পর্যাপ্ত ব্রেস্টফিডিং করান না। বাচ্চাদের যদি মায়েরা নিয়মিত বুকের দুধ না খাওয়ান, তাহলে বাচ্চা তো অপুষ্টিতে থাকবেই।’