যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের রেশ ধরে সামরিক ক্ষেত্রে একে অপরের আরও কাছাকাছি চলে এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও ইসরায়েল। যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, দুই দেশ যৌথভাবে নতুন ও অত্যাধুনিক অস্ত্র কেনা এবং অস্ত্র তৈরির বড় প্রতিরক্ষা তহবিল গঠন করেছে।
সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইকে এসব তথ্য জানিয়েছেন জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ও সাবেক দুই কর্মকর্তা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনে বর্তমানে কর্মরত আছেন এমন এক কর্মকর্তা বলেন, এই নতুন প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের অংশ হিসেবে দুই দেশ অস্ত্র ব্যবস্থার ‘যৌথ ক্রয়’ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেবে। সেইসঙ্গে ইসরায়েলি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত উন্নয়নেও আরব আমিরাত অর্থায়ন করতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আমিরাত সফরের বিষয় উল্লেখ করে এই কর্মকর্তা আরও জানান, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ চলাকালীন নেতানিয়াহু আমিরাত সফর করেন। ওই সময় দুই দেশের মধ্যে চুক্তির চূড়ান্ত রূপ দেখা যায়।
নেতানিয়াহুর কার্যালয় এই সফর নিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি জারি করে। তবে আবুধাবি নেতানিয়াহুর সফরের বিষয় প্রত্যাখ্যান করেছে।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত ওয়াশিংটনে থাকা আরব আমিরাত এবং ইসরায়েলের দূতাবাস মিডল ইস্ট আইয়ের মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া দেয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তা বলেন, আরব আমিরাত ও ইসরায়েল যৌথভাবে ড্রোনবিরোধী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অন্যান্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় ও বিকাশের কথা ভাবছে।
সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, এই তহবিলে ‘প্রচুর অর্থ’ বরাদ্দ করা হয়েছে। দুই দেশের মধ্যকার চুক্তি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বাইরেও প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন তিনি।
তেল আবিবভিত্তিক থিংক ট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো ইয়োয়েল গুজানস্কি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের সম্পর্ক এখন ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। কোনো আরব দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের এটিই সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে পাল্টা হামলা শুরু করে ইরান। এর মধ্যে আরব আমিরাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ইরানের হামলায় দেশটিতে প্রায় ৩ হাজার ড্রোন ও মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে।
মে মাসের শুরুর দিকে ইসরায়েলে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি বলেছেন, যুদ্ধ চলাকালীন আরব আমিরাতে আয়রন ডোম আকাশ প্রতিরক্ষা এবং সেগুলো পরিচালনার জন্য কর্মী মোতায়েন করেছিল ইসরায়েল।
গুজানস্কি বলেন, অস্ত্র ব্যবস্থা তৈরির জন্য একটি যৌথ তহবিল গঠন করা দুই দেশের জন্যই পরবর্তী একটি যৌক্তিক পদক্ষেপ। কারণ আমিরাতের আছে অর্থ ও সম্পদ, ইসরায়েলের আছে প্রযুক্তি।
যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যয় একটি জটিল বিষয় হতে পারে। ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়ার কথা মাথায় রেখে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার জন্য যৌথ তহবিল গঠনে একত্রিত হচ্ছে, তবে তারা বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হয়েছে।
আরব আমিরাতের জন্য এটি সহজ। কারণ আরব আমিরাত আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিরক্ষা বাজেট প্রকাশ করে না। তবে কিছু আনুমানিক তথ্যমতে, ২০২৬ সালে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় ছিল ২৭ বিলিয়ন ডলার। ইরানের হামলার প্রতিক্রিয়ায় সব উপসাগরীয় দেশ তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াবে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আরব আমিরাত সাতটি আমিরাত নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ও ধনী আমিরাত হলো আবুধাবি। ফেডারেল সরকারের মূল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে আবুধাবি। শাসক মোহাম্মদ বিন জায়েদ হলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট। আবুধাবি একাই তার সার্বভৌম তহবিলগুলোর মাধ্যমে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার নিয়ন্ত্রণ করে। দেশের অধিকাংশ তেলের মজুত তাদের হাতেই রয়েছে।
ব্লুমবার্গ মে মাসে রিপোর্ট করেছিল, আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স খালেদ বিন মোহাম্মদ আল-নাহিয়ান প্রতিরক্ষাকেন্দ্রীক একটি বিনিয়োগ মাধ্যম তৈরির বিষয়ে মুবাদালা ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির সিইও খালদুন আল-মুবারক এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও গভীর করার এই সক্ষমতা ছিল ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডস চুক্তির প্রধান সুবিধা। এই চুক্তির মাধ্যমেই ইসরায়েলের সঙ্গে আমিরাতের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়েছিল।
২০২৫ সালের জুনে আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান এজ গ্রুপ ইসরায়েলের ড্রোন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থার্ডআই সিস্টেম-এ ৩০ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণ করে। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির নিয়ার ইস্টার্ন স্টাডিজের অধ্যাপক বার্নার্ড হেকেল বলেন, এই চুক্তিটি আগের প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলোর একটি ধারাবাহিকতা। এটি উভয় পক্ষের জন্যই ভালো হবে।
ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরক্ষা খাতে যুক্তরাষ্ট্রে ভর্তুকির সুবিধাভোগী। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির কস্টস অব ওয়ার প্রজেক্ট অনুসারে, সামরিক সাহায্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের জন্য প্রতি বছর প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। শুধু ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশটির সুরক্ষায় অতিরিক্ত ২১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরায়েলকে হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নেওয়া ধীরে ধীরে বন্ধ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে রাজনৈতিক অঙ্গনের সব প্রান্তের তরুণ ভোটারদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
হেকেল বলেন, আরব আমিরাতের অর্থ আছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রেরি আর্থিক সহায়তা হুমকির মুখে পড়ছে। এই সময়ে এসে ইসরায়েল আরব আমিরাতের দিকে ঝুঁকবে না কেন? ইসরায়েলের বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন।
আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কাতার সবাই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তারা ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান নেয়।
সৌদি আরব ও আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রকে বর্ধিত ঘাঁটি এবং আকাশসীমা ব্যবহারের সুবিধা দেয়। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আরব আমিরাত ও সৌদি আরবও ইরানে হামলা চালিয়েছিল।
কিন্তু একই সময়ে, সৌদি আরব যুদ্ধ শেষ করার জন্য পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকে সমর্থন করার দিকে ঝুঁকে পড়ে। অন্যদিকে আরব আমিরাত সেই আলোচনা বন্ধ করার চেষ্টা করে। যুক্তরাষ্ট্র যাতে ইরানের ওপর হামলা অব্যাহত রাখে সেজন্য প্রকাশ্যে ও গোপনে তদবির করেছিল আবুধাবি।
এখন হরমুজ প্রণালিতে তেহরান আরও শক্তিশালী হওয়ার মাধ্যমে এই যুদ্ধের অবসান ঘটাবে কিনা তা নিয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থানে আবুধাবি।
ইউরেশিয়া গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিরাস মাকসাদ বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর ধারণা, ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যে চুক্তিই করুক না কেন, তা কেবল পারমাণবিক সমঝোতা ও হরমুজ প্রণালির ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হবে। অন্যদিকে বিপদে পড়বে তারা। উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের সহযোগী গোষ্ঠী, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন মোকাবিলা নিজেদেরই করতে হবে।
ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার ক্ষেত্রে আরব আমিরাতের এই পদক্ষেপ অন্য প্রতিবেশীদের থেকে আলাদা। সৌদি আরব ওয়াশিংটনের নিরাপত্তার ছায়ায় পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিশরের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করেছে।
রয়টার্স গত সোমবার রিপোর্ট করেছে, পাকিস্তান সৌদি আরবে আট হাজার সেনা, যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন এবং একটি চীনা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে। মাকসাদ বলেন, আমিরাতিরা সেই প্রক্রিয়ার অংশ হবে না। ইরানিদের সঙ্গে তাদের দর-কষাকষির প্রধান মাধ্যম হলো ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক।
তার মতে, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক যত বেশি শত্রুতামূলক হবে, আরব আমিরাত ইসরায়েলের তত বেশি কাছাকাছি আসবে। এই প্রক্রিয়ায় আমিরাত নিজেদের নিরাপত্তা সম্পর্কগুলো আরও উন্নত করবে।