ঢাকা ও দিল্লি ডেস্ক: বাংলাদেশে সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলের অবসান ঘটিয়ে শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় গ্রহণের পর, দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে এক নতুন কূটনৈতিক সমীকরণের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কদের ডিবি হেফাজত থেকে মুক্তি এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার ‘সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের’ (Reset) এক বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আন্দোলনের টার্নিং পয়েন্ট ও ডিবি হেফাজত
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলনের উত্তাল সময়ে নাহিদ ইসলামসহ প্রধান তিন সমন্বয়ককে হাসপাতাল থেকে তুলে নিয়ে ডিবি হেফাজতে রাখা হয়েছিল। সরকারের পক্ষ থেকে একে ‘নিরাপত্তা’ বলা হলেও জনগণের মধ্যে এর তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে তাদের মুক্তি এবং শেখ হাসিনা সরকারের পতন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অভাবনীয় পরিবর্তন নিয়ে আসে। এই পরিবর্তনের ঢেউ ভারতের নীতিনির্ধারকদেরও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
দিল্লির ‘হাসিনা-নির্ভর’ নীতির চ্যালেঞ্জ
গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারত মূলত শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, দিল্লির এই ‘একমুখী’ নীতি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরণের ভারত-বিরোধী মনোভাব তৈরি করেছে। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর এই ক্ষোভ আরও প্রকাশ্যে আসে। তবে বর্তমানে দিল্লির পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে কাজ করার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যা দুই দেশের তিক্ততা দূর করার একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ।
নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগ
ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) নিরাপত্তা। শেখ হাসিনার আমলে ভারত এই নিশ্চয়তা পেয়েছিল যে বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ভারতকে আক্রমণ করতে পারবে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের প্রধান লক্ষ্য হলো এই নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত রাখা। অন্যদিকে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক হত্যাকাণ্ড বন্ধ এবং অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের বিষয়টি বড় দাবি হিসেবে সামনে আসছে।
সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও মোদী-ইউনূস সংলাপ
ক্ষমতা পরিবর্তনের পর বাংলাদেশে হিন্দুসহ অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর বিচ্ছিন্ন কিছু হামলার খবর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। তবে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বারবার আশ্বস্ত করেছেন যে, বাংলাদেশে সকল নাগরিকের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। এই আশ্বাস দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের আস্থার সংকট নিরসনে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
বাণিজ্য, কানেক্টিভিটি ও আদানি ইস্যু
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে থাকা ট্রানজিট, রেল যোগাযোগ এবং আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎ সরবরাহ চুক্তির মতো বড় প্রকল্পগুলো নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই প্রকল্পগুলো দুই দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের সাথে জড়িত, তাই এগুলো পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে চুক্তির স্বচ্ছতা ও শর্তাবলী নিয়ে বাংলাদেশের নতুন সরকারের পক্ষ থেকে পর্যালোচনার দাবি উঠতে পারে।
উপসংহার: বন্ধুত্বের নতুন সংজ্ঞা
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভারত যদি শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বদলে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দেয়, তবেই এই ‘রিসেট’ বা সম্পর্কের পুনর্গঠন সফল হবে। দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের স্বার্থে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সমমর্যাদা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে একটি টেকসই বন্ধুত্ব এখন সময়ের দাবি।
মুল লিখা- বিমান মুখার্জি
তথ্যসুত্র লিংক Hope for India-Bangladesh reset after arrests in student leader’s killing





