ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে দূরবর্তী দেশগুলোতেও পড়তে শুরু করেছে। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিচ্ছে। কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সরকার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো জ্বালানি ঘাটতি রোধে বেশ হিমশিম খাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) এক প্রতিবেদনে আলজাজিরা জানিয়েছে, ফিলিপাইনে সরকারি দপ্তরগুলো কার্যদিবস কমিয়ে চার দিনের কর্মসপ্তাহে চলে গেছে। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে কর্মকর্তাদের বাড়ি থেকে কাজ করতে এবং অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ কমাতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। আর মিয়ানমারে জ্বালানি সাশ্রয়ে পর্যায়ক্রমে গাড়ি চালানোর নিয়ম চালু করেছে সরকার।
জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে কয়েকটি দেশ সরাসরি বাজারেও হস্তক্ষেপ করছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল ডিজেলের ওপর অস্থায়ী মূল্যসীমা ঘোষণা করেছেন। অন্যদিকে ভিয়েতনাম জানিয়েছে, তারা জ্বালানির দাম স্থিতিশীল রাখতে গঠিত বিশেষ তহবিল থেকে অর্থ ছাড় করা শুরু করেছে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এশিয়া ডিকোডেডের পরিচালক ও প্রধান অর্থনীতিবিদ প্রিয়াঙ্কা কিশোরের মতে, এসব পদক্ষেপ আসলে সম্ভাব্য বড় সংকটের আগাম প্রস্তুতি। তিনি বলেন, ‘সরবরাহ সংকট সরাসরি আঘাত হানার আগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে দেশগুলো।’
প্রচুর জীবাশ্ম জ্বালানি সম্পদ থাকলেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো আমদানি করা তেল ও গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এসব জ্বালানির বড় অংশই যায় গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে।
মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৮৪ ও ৮৩ শতাংশই এশিয়ার বাজারে পাঠানো হয়েছিল। সংস্থাটির হিসাবে, চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া মিলেই প্রায় ৭০ শতাংশ তেল আমদানি করে। আর বাকি প্রায় ১৫ শতাংশ যায় এশিয়ার অন্যান্য দেশে।
জাকার্তার আসিয়ান এবং পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ইআরআইএ) অর্থনীতিবিদ অ্যালয়সিয়াস জোকো পুরওয়ান্তোর মতে, অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ ব্যাহত হলে ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ব্রুনাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। তিনি জয়েন্ট অর্গানাইজেশনস ডেটা ইনিশিয়েটিভের তথ্য উদ্ধৃত করে বলেন, এই চার দেশ তাদের অপরিশোধিত তেলের ৬০ থেকে ৯৫ শতাংশই আমদানির ওপর নির্ভর করে।
পুরওয়ান্তোর মতে, তেল উৎপাদনকারী দেশ হলেও ইন্দোনেশিয়াও তার অপরিশোধিত তেলের এক-তৃতীয়াংশের বেশি আমদানি করে। সরবরাহ ব্যবস্থায় ধাক্কার কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সীমিত জ্বালানি মজুতের বিষয়টিও সামনে এসেছে। গুরুত্বপূর্ণ জলপথে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় এসব মজুতের ওপর প্রতিদিনই চাপ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ভিয়েতনাম মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে থেকে প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল সংগ্রহের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের গবেষক স্যাম রেনল্ডসের মতে, এই পরিমাণ তেল ভিয়েতনামের জন্য মাত্র ছয় দিনের চাহিদা পূরণ করতে পারবে। তিনি বলেন, ‘নতুন করে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ না এলে দেশটি বড় ধরনের জ্বালানি ঘাটতির ঝুঁকিতে পড়তে পারে।’
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির বর্তমানে প্রায় ২০ দিনের জ্বালানি মজুত রয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি ইন্দোনেশিয়ার হাতে প্রায় ২১ থেকে ২৩ দিনের জ্বালানি মজুত আছে।
থাইল্যান্ডের জ্বালানিমন্ত্রী অটাপোল রের্কপিবুন গত সপ্তাহে বলেন, দেশটিতে প্রায় ৬৫ দিনের জ্বালানি মজুত রয়েছে। সরকার আরও ৩০ দিনের অতিরিক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।
ফিলিপাইনে জ্বালানি মজুত রয়েছে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ দিনের জন্য। তবে এর বেশিরভাগই বেসরকারি খাতের বাণিজ্যিক মজুত। ফলে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে, পেট্রোলিয়াম পণ্যের ওপর আবগারি কর কমানো, ফিলিপাইনের জাতীয় তেল কোম্পানির মাধ্যমে অতিরিক্ত আমদানি এবং বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কাছে জরুরি ভিত্তিতে মজুত ছাড়ের অনুরোধ।
রেনল্ডস বলেন, ‘সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বিকল্প উৎস খুঁজে পাওয়া সব দেশের জন্যই কঠিন হয়ে পড়ছে। স্বল্পমেয়াদে বিকল্প খুবই সীমিত। কারণ বিভিন্ন শোধনাগার নির্দিষ্ট ধরনের অপরিশোধিত তেলের জন্য তৈরি। এর সঙ্গে রয়েছে দীর্ঘ শিপিং দূরত্ব ও বাড়তি খরচের বিষয়।’
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জরুরি জ্বালানি মজুত উত্তর-পূর্ব এশিয়ার তুলনায় অনেক কম। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জাপানের হাতে প্রায় ২৫৪ দিনের জ্বালানি মজুত রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার মজুত প্রায় ২০৮ দিনের, আর চীনের মজুত প্রায় ১২০ দিনের।
অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কমে গেলে শুধু সেই ঘাটতি পূরণ করাই বড় চ্যালেঞ্জ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত আছে তেল পরিশোধনের পর পাওয়া বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্যের সরবরাহও। কারণ অপরিশোধিত তেল থেকে পেট্রোল, ডিজেল, জেট জ্বালানি ও বিভিন্ন পেট্রোকেমিক্যাল তৈরি হয়। তাই কাঁচা তেলের পাশাপাশি এসব পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করাও অর্থনীতিগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
ইআরআইএ অর্থনীতিবিদ অ্যালয়সিয়াস জোকো পুরওয়ান্তোর বলেন, লাওস, কম্বোডিয়া ও মিয়ানমারের নিজস্ব তেল শোধনাগারের সক্ষমতা খুবই সীমিত বা নেই বললেই চলে। ফলে এসব দেশকে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও সিঙ্গাপুর থেকে রপ্তানি হওয়া জ্বালানি পণ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়।
তিনি বলেন, এশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোর উৎপাদন কমে গেলে এবং দেশগুলো যদি নিজেদের সরবরাহ ধরে রাখতে পেট্রোলিয়াম রপ্তানিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করে, তাহলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে। এরই মধ্যে থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও লাওস ছাড়া অন্য সব দেশে তেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করার পদক্ষেপ নিয়েছে। আরেক বড় সরবরাহকারী দেশ চীনও রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোকে জ্বালানি রপ্তানি স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছে।
আলজাজিরা বলছে, সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন বাড়তে থাকায় বিভিন্ন পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করতে শুরু করেছে। এর অর্থ হলো, তারা হয়তো চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ দিতে পারবে না। এর মধ্যে রয়েছে সিঙ্গাপুরের অ্যাস্টার কেমিক্যালস অ্যান্ড এনার্জি এবং ইন্দোনেশিয়ার পিটি চন্দ্র আসরি প্যাসিফিক।
মঙ্গলবার থাইল্যান্ডের শিল্পগোষ্ঠী সিয়াম সিমেন্ট গ্রুপেরএকটি ইউনিট রায়ং ওলেফিনস জানায়, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় ন্যাপথা ও প্রোপেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল না পাওয়ায় তাদের কারখানার কার্যক্রম স্থগিত করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এ অঞ্চলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে তেল ও গ্যাস ব্যবহারের ওপর নতুন বিধিনিষেধও আরোপ করা হতে পারে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বুধবার এক গবেষণা নোটে জানিয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮০ ডলার হতে পারে। প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও বাড়তে পারে, যা এশিয়ার বেশিরভাগ দেশে মুদ্রাস্ফীতি বাড়াবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দেবে।
এশিয়া ডিকোডেডের প্রধান অর্থনীতিবিদ প্রিয়াঙ্কা কিশোরের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অঞ্চলটি অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তিনি, ‘দুই বা তিন সপ্তাহের মধ্যেই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। যদি তখনও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হয়, তাহলে তা বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।





