নিজস্ব প্রতিবেদক, ব্রিকলেন নিউজ, পিরোজপুর:
কাগজে-কলমে জমজমাট, বাস্তবে ফাঁকা
শিক্ষক ১১ জন, কর্মচারী ২ জন এবং খাতায়-কলমে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১২০। একটি গ্রামীণ বিদ্যালয়ের জন্য এটি বেশ স্বাভাবিক একটি চিত্র হতে পারত। কিন্তু পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার মৈশানী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের বাস্তব চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুরো বিদ্যালয়ে উপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র সাতজন! তবে শিক্ষার্থী সংকটের চেয়েও বেশি চমকপ্রদ ছিল এক শিক্ষকের অদ্ভুত যুক্তি—তাঁর মতে, জন্মনিয়ন্ত্রণের কারণে জনসংখ্যা কমে যাওয়াই এই সংকটের মূল কারণ।
শ্রেণিকক্ষের বেহাল দশা ও অদ্ভুত যুক্তি
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিদ্যালয়টির ষষ্ঠ শ্রেণিতে উপস্থিত মাত্র একজন, নবম ও দশম শ্রেণিতে তিনজন করে মোট ছয়জন। আর সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থীর দেখাই মেলেনি।
কাগজে-কলমে থাকা বাকি ১১৩ জন শিক্ষার্থী কোথায়—এমন প্রশ্নের সন্তোষজনক কোনো উত্তর দিতে পারেনি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। উল্টো বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পঙ্কজ কুমার মণ্ডল এই তীব্র সংকটের জন্য দায়ী করেছেন জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিকে। তিনি বলেন,
“শিক্ষার্থী সংকটের পেছনে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে যাওয়া, স্বল্প সন্তান পরিবার এবং এলাকার ভৌগোলিক পরিবেশ দায়ী।”
এসএসসি পরীক্ষার বিপর্যয় ও ‘ভাড়া করা’ পরীক্ষার্থী
বিদ্যালয়টির শিক্ষার মান ও পাসের হার নিয়েও রয়েছে বিস্তর প্রশ্ন। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ১১ জন অংশ নিয়ে পাস করেছে মাত্র একজন। এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালেও আটজন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছিল মাত্র একজন। অর্থাৎ, বিগত দুই বছরে ১৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৭ জনই অকৃতকার্য হয়েছে।
বিদ্যালয়ে নিয়মিত শিক্ষার্থী না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এতজন পরীক্ষার্থী অংশ নিল—এর নেপথ্যে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। নিয়ম অনুযায়ী, এমপিওভুক্তি বা স্বীকৃতি টিকিয়ে রাখতে এসএসসি পরীক্ষায় অন্তত ১০ থেকে ১২ জন পরীক্ষার্থী দেখাতে হয়। বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা পর্ষিয়া রানী হালদার অবলীলায় স্বীকার করেন যে, কোটা পূরণের জন্য পাশের ‘সপ্তগ্রাম সম্মিলনী বিদ্যালয়’-এর টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থীকে তাদের বিদ্যালয় থেকে ফরম পূরণ করিয়ে বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি তিনি শিক্ষার্থী সংকটের জন্য বিদ্যালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, জরাজীর্ণ ওয়াশরুম এবং সার্বিকভাবে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে না পারার ব্যর্থতার কথাও উল্লেখ করেন।
প্রশাসনের বক্তব্য ও পদক্ষেপ
১০ আগস্ট ফলাফল প্রকাশের পর বিষয়টি স্থানীয় সাংবাদিক ও শিক্ষা প্রশাসনের নজরে আসে। এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জহিরুল আলম গণমাধ্যমকে জানান, ১১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র একজনের পাসের বিষয়টি তিনি অবগত। তাছাড়া অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এনে অনৈতিকভাবে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের যে অভিযোগ উঠেছে, সেটিও তার জানা আছে। তিনি বলেন, “এ বিষয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে খুব শিগগিরই লিখিতভাবে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।”
জবাবদিহির অভাব ও শিক্ষার নামে প্রহসন
মৈশানী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের এই চিত্র দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থার এক চরম অব্যবস্থাপনা ও দুর্বল নজরদারির প্রতিচ্ছবি। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অন্য বিদ্যালয়ের অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দিয়ে বোর্ড পরীক্ষা দেওয়ানো এবং নিজেদের কাঠামোগত ব্যর্থতা ঢাকতে ‘জন্মনিয়ন্ত্রণ’-এর মতো ভিত্তিহীন যুক্তি দাঁড় করানো—উভয়ই চরম প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রমাণ। শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কঠোর তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।