অন্তর্বর্তী সরকার গত দেড় বছরে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের কার্যত ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে’ পরিণত করেছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস।
রোববার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় ‘অর্জন’ হলো বাংলাদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে স্থায়ীভাবে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের অবস্থানে ঠেলে দেওয়া।
চট্টগ্রামের রাউজান ও মিরসরাইয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পুড়ে যাওয়া বাড়িঘর পরিদর্শন শেষে ‘সিটিজেনস অব হিউম্যান রাইটস’ এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সংগঠনটির তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে ওই দুই উপজেলায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্তত ১৯টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় রাতের আঁধারে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে আগুন দেওয়া হয়।
নির্বাচনের আগে এ ধরনের ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা’ উল্লেখ করে অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, এসব ঘটনায় কোনো লুটপাট হয়নি শুধু আগুন দেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই, ভয় তৈরি করা, যাতে সংখ্যালঘুরা ভোট দিতে না যায়। তিনি বলেন, এটি সংখ্যালঘুদের পুড়িয়ে মারার প্রচেষ্টারই আরেক রূপ।
তিনি আরও বলেন, সংখ্যালঘুরা এক ধরনের দ্বিমুখী সংকটে আটকে পড়েছে। ভোট দিতে গেলে নিরাপত্তাহীনতা, আর ভোট না দিলে রাজনৈতিকভাবে দোষারোপের শিকার হওয়ার আশঙ্কা। প্রশ্ন হচ্ছে রাষ্ট্র কি ভোট দিতে যাওয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে, কিংবা ভোট দিয়ে ফিরে এসে একজন মানুষ নিরাপদে নিজের ঘরে থাকতে পারবে কি না।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ঘুষ ও তদবির সংস্কৃতি বন্ধে প্রশাসনের ব্যর্থতাই সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, রাষ্ট্র ও প্রশাসন যখন প্রান্তিক মানুষের থেকে দূরে সরে যায়, তখন অসহায় মানুষের সামনে ন্যায়বিচারের আর কোনো পথ থাকে না।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকা সত্ত্বেও গত ১৮ মাসে অন্যান্য ধর্ম শান্তিপূর্ণভাবে পালন করা যায়নি যা গভীরভাবে উদ্বেগজনক।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ‘সিটিজেনস অব হিউম্যান রাইটস’-এর প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন বলেন, রাউজান ও মিরসরাইয়ের অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলোতে প্রতীয়মান হয় যে পুরো পরিবারকে পুড়িয়ে মারাই ছিল হামলাকারীদের উদ্দেশ্য। এসব এলাকার সংখ্যালঘু পরিবারগুলো এখন রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে এবং নিজেদের নিরাপত্তায় সিসিটিভি ক্যামেরা বসাতে বাধ্য হচ্ছে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘুদের ওপর এমন সহিংসতার মূল লক্ষ্য হলো আতঙ্ক সৃষ্টি করে তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা।
সংগঠনের পক্ষ থেকে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা, সহিংস ঘটনার দ্রুত তদন্ত ও দোষীদের গ্রেপ্তার, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন, মানসিক সহায়তা প্রদান এবং মানবাধিকার কমিশনের সক্রিয় নজরদারি।
সংবাদ সম্মেলন থেকে নির্বাচনমুখী সব রাজনৈতিক দলের প্রতি সংখ্যালঘুদের ভোটাধিকার ও নির্বাচন-পরবর্তী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়।





