প্রতিবেদক, ব্রিকলেন নিউজ ,ঢাকা:
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প এখন তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জে গ্যাসের তীব্র প্রেসারস্বল্পতা ও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় গত কয়েক সপ্তাহে কারখানাগুলোর উৎপাদন প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। ফলে সময়মতো আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে নির্ধারিত পণ্য বা শিপমেন্ট পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। নির্ধারিত সময়সীমা বা ডেডলাইন মিস হওয়ায় বিদেশি বায়াররা চুক্তি অনুযায়ী ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ কেটে রাখছেন, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ডাইং ও প্রক্রিয়াজাতকরণে স্থবিরতা: ভেঙে পড়েছে উৎপাদন চেইন
পোশাক তৈরির মূল প্রক্রিয়ায় ডাইং (রং করা), নিটিং (বয়ন), কাটিং, সেলাই ও ফিনিশিং একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গ্যাসের অভাবে জেলার প্রায় দেড় শতাধিক ডাইং কারখানার কাজ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্যানুযায়ী:
-
উৎপাদন সক্ষমতায় ধস: যে কারখানার দৈনিক ৩০ টন কাপড় রং করার সক্ষমতা রয়েছে, সেখানে বর্তমান গ্যাস সংকটে উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ১ থেকে ২ টনে।
-
সিএনজি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা: অতীতে বিকল্প হিসেবে সিএনজি স্টেশন থেকে সিলিন্ডারে গ্যাস এনে সীমিত আকারে কারখানা চালু রাখার যে প্রক্রিয়া ছিল, নতুন নির্দেশনায় তাও বন্ধ হয়ে গেছে।
-
সাপ্লাই চেইন ব্যাহত: ডাইং কারখানায় কাপড় তৈরি না হওয়ায় গার্মেন্টসে কাটিং, সেলাই ও ফিনিশিং লাইনগুলো অলস বসে থাকছে, যার ফলে পুরো প্রোডাকশন চেইন বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।
আর্থিক লোকসান ও বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার চাপ
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর হিসাব মতে, চলমান এই জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের তৈরি পোশাক খাতে এরই মধ্যে প্রায় ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) মার্কিন ডলারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতি হয়েছে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের হিসাব:
একটি বড় মাপের গার্মেন্টস কারখানা এক দিন বন্ধ থাকলে গড়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতি বা স্থায়ী ব্যয় (Fixed Cost) বহন করতে হয়। মাঝারি কারখানার ক্ষেত্রে প্রতিদিনের ক্ষতি ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকা। উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ বিল, ব্যাংক ঋণের কিস্তি ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় অপরিবর্তিত থাকছে।
এর ফলে আন্তর্জাতিক তৈরি পোশাক বাজারে বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্যতা হ্রাস পাচ্ছে। বাংলাদেশ সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করতে ব্যর্থ হওয়ায় বিদেশি বায়াররা আস্থাহীনতায় ভুগছেন এবং তাদের নতুন ক্রয়াদেশ বা অর্ডারগুলো ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোতে স্থানান্তরিত হচ্ছে।
বিসিক ও নারায়ণগঞ্জের শিল্প পরিবেশের চিত্র
প্রাচ্যের ডান্ডি খ্যাত নারায়ণগঞ্জে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ২০০টি পোশাক ও আনুষঙ্গিক শিল্পকারখানা রয়েছে, যেখানে প্রায় ২০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান যুক্ত। তবে ক্রমাগত গ্যাস সংকট, উচ্চ ব্যাংক সুদহার, এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার যৌথ প্রভাবে গত এক বছরে জেলায় দুই ডজনেরও বেশি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার পোশাক শ্রমিক।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জের বিসিক শিল্পনগরীতে মোট ২৫৬টি নিবন্ধিত কারখানার মধ্যে গত দুই বছরেই ১২২টি বন্ধ হয়েছে। চালু থাকা ১৩৪টি কারখানার অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক।
সংকট সমাধানের তাগিদ ও নীতিগত বাধ্যবাধকতা
মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (FSRU) কারিগরি ত্রুটির ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ হঠাৎ হ্রাস পাওয়াই এই সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিকেএমইএর দায়িত্বশীল পর্ষদ জানিয়েছে, চলতি মাসেই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সরকারি প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেলেও অবিলম্বে নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি ও অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব পড়বে।
শিল্প খাতের নিরাপত্তা, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং বিশাল কর্মসংস্থান রক্ষার স্বার্থে এনার্জি সেক্টরে দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প কৌশল ও জরুরি টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।