দেশে হামের উচ্চ প্রকোপের মাঝেই সংকট দেখা দিয়েছে আরেক মরণব্যাধি জলাতঙ্কের ভ্যাকসিনের। এছাড়া রয়েছে শিশুদের যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, ধনুষ্টংকারসহ অন্তত পাঁচটি টিকার স্বল্পতা। এসব টিকা পেতে প্রতিনিয়ত হাসপাতালে ভিড় বাড়ছে রোগী ও স্বজনদের। ফলে মানুষের আগ্রহের কারণে টিকার সরববরাহ নিয়ে খোঁজ রাখছেন সংবাদকর্মীরা।
সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) কর্মকর্তা ও হাসপাতালের সংশ্লিষ্টরাও এ নিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। জানাতে হয় টিকার বাস্তব চিত্র। তবে এতে করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রীর তোপের মুখে পড়ছেন কর্মকর্তারা। গণমাধ্যমে টিকার সংকটের তথ্য দেওয়ায় অন্তত দুজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সর্বশেষ মুন্সীগঞ্জ ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আহাম্মদ কবীরকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। গত শুক্রবার হাসপাতালটিতে পরিদর্শনে গিয়ে এ ঘোষণা দেন মন্ত্রী। জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নিয়ে ‘ভুল তথ্য’ ছড়ানোর অভিযোগে ওই কর্মকর্তাকে এ শাস্তি দেওয়া হয়।
এর আগে জলাতঙ্কের টিকার সংকট নিয়ে বিবিসি বাংলায় কথা বলেছিলেন ডা. আহাম্মদ কবীর। বিবিসির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, মুন্সিগঞ্জ ২৫০ বিশিষ্ট হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ৩০ জন ব্যক্তি কুকুর অথবা বিড়ালের কামড় খেয়ে টিকা নিতে আসেন। কিন্তু টিকা স্বল্পতার কারণে অনেককে ফিরে যেতে হয়। বিশেষ করে বিড়ালের ক্ষেত্রে কোনো টিকাই দেওয়া হয় না। ইপিআই থেকে টিকা না দেওয়া এবং অর্থের অভাবে নিজস্ব তহবিল থেকে কিনতে না পারায় এমন সংকট।
ওই সাক্ষাৎকারে আহম্মাদ কবীর বলেন, ভ্যাকসিন সংকটের কারণে সবাইকে দেওয়া যাচ্ছে না। আমাদের অন্য ফান্ডে যে সামান্য কিছু টাকা বেঁচে গেছে, সেটা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। ১২০টা ভ্যাকসিন কিনলে আমার লক্ষ্য থাকে এক মাস চালানো। যদি সবাইকে দেই তাহলে সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। বাকি দিনগুলোতে কেউ পাবে না।
তিনি বলেন, ‘আমরা এখন টিকার রেশনিং করছি। যাদের জরুরি প্রয়োজন এবং খুবই দরিদ্র, শুধু তাদের বিনামূল্যে দিচ্ছি। যাদের কেনার সামর্থ্য আছে কিংবা বিড়াল বাসায় পালে তাদেরকে কিনে দিতে বলছি।’ বিবিসি বাংলায় এমন বক্তব্য দেওয়ার পর ওই কর্মকর্তাকে সরানোর নির্দেশ দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
এর আগেও একই রকমের ঘটনা ঘটেছে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে টিকা সংকট নিয়ে চলতি মাসের শুরু থেকে সংবাদমাধ্যমে একের পর এক খবর প্রকাশিত হতে থাকে। যা নিয়ে চরম সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার। এসব সংবাদে ইপিআইয়ের মুখপাত্র হিসেবে বক্তব্য দিতে হয়েছে উপ-পরিচালক ডা. শাহরিয়ার সাজ্জাদকে। পরে গত ১৬ এপ্রিল এই কর্মকর্তাকে ইপিআই থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে তাকে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সংযুক্ত রাখা হয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী নন শাস্তির মুখে পড়া স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। শনিবার রাতে অনেক চেষ্টার পর কথা হয় ডা. শাহরিয়ার সাজ্জাদের সঙ্গে। আমাদের প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘এককভাবে ওই কারণে নাকি আরও কোনো কারণে করেছে জানি না।’ এর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি তিনি।
সংবাদমাধ্যমে তথ্য দেওয়ায় এমন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এমন সিদ্ধান্তে সরকারের কঠোর সমালোচনা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, এভাবে শাস্তি দিলে কেউ আর সঠিক তথ্য দেবে না। আর মাঠ পর্যায়ের সংকটের চিত্র না পেলে সরকারের পুরো কর্মসূচি ব্যর্থ হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী যখন ডা. আহাম্মদ কবীরকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন, তখন তার সঙ্গে ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। এ সম্পর্কে জানতে মহাপরিচালকের মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান আমাদের প্রতিবেদককে বলেন, ‘শুধু সংবাদমাধ্যমে তথ্য দেওয়ায় এমন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে মনে হয় না। যদিও সংবাদমাধ্যমে তাই এসেছে।’
তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বোচ্চ কর্তা স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি যখন কোনো নির্দেশনা দেন সেটির বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই অধিদপ্তরের। এমনকি ঘটনা প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছে, আসলেই তিনি ভুল তথ্য দিয়েছেন কিনা; তা যাচাইয়েরও সুযোগ নেই। কারণ, সরাসরি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
এই কর্মকর্তা বলেন, ‘সাধারণত এসব ঘটনায় অধস্তনদের নোট নিতে বলা হয়, খতিয়ে দেখে সত্যতা পেলে তখন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু এখানে অধিদপ্তরের করার কিছু নেই।’
তথ্য দিয়ে কর্মকর্তাদের শাস্তির মুখে পড়া নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কঠোর সমালোচনা করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবু জামিল ফয়সাল। আমাদের প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে যারা আছেন বিশেষ করে হাসপাতালের প্রধান, তাদের কাছে সবসময় আসল চিত্র থাকে। সঠিক তথ্য পেলে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়। এখন সংবাদমাধ্যমে সেই তথ্য দিয়ে যদি কর্মকর্তারা শাস্তির মুখে পড়েন, প্রত্যাহার বা ওএসডি হোন সেটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘কোনো রোগী ভ্যাকসিন না পেলে হাসপাতালের যিনি দায়িত্বে থাকেন তার কাছেই যান, মন্ত্রীর কাছে নয়। এ ধরনের পদক্ষেপে চাকরি হারানোর ভয়ে প্রতিষ্ঠানের কেউ আর সত্য তথ্য দিতে চাইবেন না। ফলে কোথায় টিকার ঘাটতি, জনবলের সমস্যা, ব্যবস্থাপনায় জটিলতা—এগুলো সামনে আসবে না। আর না এলে চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কর্মসূচিতে।’
তিনি বলেন, ‘মন্ত্রীর উচিত ছিল সবকিছু শোনা। এরপর সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া যে, অমুক প্রতিষ্ঠানের সংকটের কথা বলেছে। প্রকৃত অবস্থা কী খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা। তা না করে সরিয়ে দিলে যে লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে, তা অর্জন হবে না।’
সম্প্রতি একাধিক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাবি করেন, হাম, রুবেলা ও জলাতঙ্কসহ কোনো টিকার সংকট নেই। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। সংকটের বিষয়টি ইপিআইও স্বীকার করছে।
জলাতঙ্কের টিকা মূলত দেওয়া হয় কুকুর কিংবা বিড়ালের কামড় বা আঁচড় খেলে। এজন্য এআরভি বা অ্যান্টি র্যাবিস ভ্যাকসিন এবং আরআইজি বা র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন নামে দুটি ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। এর মধ্যে কামড় একটু বেশ ক্ষতিকর হলে দেওয়া হয় আরআইজি ভ্যাকসিন। দেশের হাসপাতালগুলোতে সংকট দেখা দিয়েছে এ ভ্যাকসিনের।
রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এ ভ্যাকসিনের সরবরাহ শতভাগ থাকলেও উল্টো চিত্র ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতে। মূলত কেন্দ্রীয়ভাবে মজুত না থাকায় এমন জটিলতা বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। নিউমোনিয়া, যক্ষ্মাসহ শিশুদের জন্য নির্ধারিত টিকার পাঁচটিরও কেন্দ্রীয় মজুত শূন্য। ইপিআই-এর মাধ্যমে ৯টি টিকার মাধ্যমে ১২টি রোগ প্রতিরোধ করা হয়। শিশুদের জন্য নির্ধারিত সাতটি টিকার মধ্যে রয়েছে—নিউমোনিয়া প্রতিরোধে পিসিভি, যক্ষ্মার জন্য বিসিজি, পোলিওর নির্মূলে ওপিভি ও আইপিভি, টাইফয়েডের জন্য টিসিভি, হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে এমআর এবং পাঁচটি রোগ (ধনুষ্টংকার, হুপিংকাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ডিপথেরিয়া ও হেপাটাইটিস-বি) প্রতিরোধে দেওয়া হয় পেন্টা টিকা। এছাড়া কিশোরীদের জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধে এইচপিভি এবং ১৫ থেকে ৪৯ বছরের নারীদের ধনুষ্টংকার ও ডিপথেরিয়া সুরক্ষায় টিডি টিকা দেওয়া হয়।
ইপিআই সূত্রে জানা গেছে, শিশুদের সাতটি টিকার মধ্যে আইপিভি ও টিসিভি থাকলেও বর্তমানে মজুত শূন্য রয়েছে—যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, হাম-রুবেলা ও পেন্টা টিকার।
বর্তমানে হাম-রুবেলার গণটিকা কর্মসূচি চলছে বিশেষভাবে কেনা টিকায়। যেখানে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী যেকোনো শিশু টিকা নিতে পারছে। টিকা ক্যাম্পেইনের মাঝেও থেমে নেই হামের সংক্রমণ। এমনকি প্রতিদিনই প্রাণহানি ঘটছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকাল ৮টা পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৩৫ হাজার ৬৭ জনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাদের ৯০ ভাগই শিশু। সংখ্যায় কম হলেও আক্রান্তদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্করাও রয়েছেন।





