৩৬ হাজারেরও কম সরকারি পদের বিপরীতে প্রায় ৪০ লাখ আবেদনকারী। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রেকর্ডসংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সম্ভাব্য প্রভাব চীনের তরুণ কর্মপ্রত্যাশীদের ওপর বাড়িয়ে তুলছে প্রতিযোগিতার চাপ।
এজেন্সি | ৩০ অক্টোবর ২০২৬
চীনের সরকারি চাকরিতে নিয়োগের পরীক্ষা এখন আর কেবল একটি নিরাপদ চাকরি পাওয়ার প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ নেই। দেশটির সরকারি প্রশাসনে প্রবেশের জন্য তরুণদের এই নজিরবিহীন আগ্রহ চীনের শ্রমবাজারে বিদ্যমান গভীর সংকটের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মন্থরতা, আবাসন খাতের দীর্ঘস্থায়ী মন্দা এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিপুলসংখ্যক স্নাতকের কর্মজীবনে প্রবেশের ফলে স্থিতিশীল কর্মসংস্থানের জন্য প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, ২০২৭ সালের জাতীয় সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় (গুওকাও) আবেদন জমা দেওয়ার শেষ সময় ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ৩৯ লাখ ৩৫ হাজার মানুষ আবেদন করেছেন। তাঁদের মধ্যে ৩৪ লাখ ৫০ হাজার প্রার্থী প্রাথমিক যোগ্যতা যাচাইয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। অন্যদিকে, ৪ লাখ ৮৫ হাজার আবেদনকারী প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন। আগামী নভেম্বরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিতব্য এই পরীক্ষার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও তাদের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানে মোট ৩৫ হাজার ৬৯১টি পদে নিয়োগ দেওয়া হবে।
এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিটি পদের বিপরীতে যোগ্য প্রার্থীর সংখ্যা প্রায় ১০০ জন। আগের বছরের তুলনায় যোগ্যতা যাচাইয়ে উত্তীর্ণ আবেদনকারীর সংখ্যা সামান্য কমলেও সরকারি চাকরির প্রতি তরুণদের ক্রমবর্ধমান আকর্ষণ স্পষ্ট। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে নিয়োগের অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবন নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে সরকারি চাকরি হয়ে উঠছে তাঁদের কাছে অন্যতম কাঙ্ক্ষিত বিকল্প।
এই প্রতিযোগিতার গুরুত্ব শুধু আবেদনকারীর সংখ্যায় নয়, বরং এর পেছনের কারণগুলোতেও নিহিত। সরকারি চাকরিতে নিয়মিত বেতন, কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা, বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা এবং সামাজিক মর্যাদা রয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যখন নিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সম্ভাবনা যখন অনিশ্চিত, তখন এসব সুবিধার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। ফলে অনেক তরুণ চীনা নাগরিকের কাছে সরকারি চাকরি এখন কেবল পেশাগত পছন্দ নয়, বরং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখার একটি কৌশল।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়া বিপুলসংখ্যক তরুণের কর্মসংস্থানের চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। চলতি বছর চীনে রেকর্ড ১ কোটি ২৭ লাখ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হয়েছেন। এতে আগে থেকেই প্রতিযোগিতাপূর্ণ শ্রমবাজারে নতুন করে বিপুলসংখ্যক চাকরিপ্রার্থী যুক্ত হয়েছেন। একই সময়ে সেপ্টেম্বরে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে শহরাঞ্চলের বেকারত্বের হার প্রায় ২০ শতাংশে পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে শিক্ষার্থীদের।
এসব পরিসংখ্যান উচ্চশিক্ষিত তরুণদের সংখ্যা এবং তাঁদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে অর্থনীতির সক্ষমতার মধ্যে ক্রমবর্ধমান অসামঞ্জস্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকে অভ্যন্তরীণ চাহিদার দুর্বলতা এবং আবাসন খাতের দীর্ঘস্থায়ী সংকট ব্যবসায়িক আস্থা ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে। একসময় যে শিল্প খাতগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের জন্য আকর্ষণীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করত, সেগুলোর অনেক ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা বেড়েছে। একই সঙ্গে নিয়োগের ক্ষেত্রে আরও বাছাইপর্ব ও কঠোর শর্ত আরোপ করছেন নিয়োগকর্তারা। ফলে বিশেষায়িত দক্ষতার চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সীমিতসংখ্যক পদের বিপরীতে যোগ্য প্রার্থীর দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিস্তার তরুণদের উদ্বেগে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান উৎপাদনশীলতা বাড়াতে অটোমেশন ও এআইনির্ভর প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। এতে প্রবেশপর্যায়ের কতগুলো চাকরি ভবিষ্যতে টিকে থাকবে এবং নিয়োগকর্তারা কী ধরনের দক্ষতা চাইবেন, তা নিয়ে তরুণদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এআইয়ের কারণে ঠিক কতসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা কঠিন। তবে কর্মসংস্থানের ঝুঁকি বাড়ার এই ধারণা তরুণদের কাছে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও স্থিতিশীল পেশা হিসেবে সরকারি চাকরির আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
গুওকাও পরীক্ষার যোগ্যতার শর্তে পরিবর্তনও প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়িয়েছে। কর্তৃপক্ষ স্নাতক ডিগ্রিধারীদের ক্ষেত্রে আবেদনের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ থেকে বাড়িয়ে ৩৮ বছর করেছে। অন্যদিকে, স্নাতকোত্তর ও ডক্টরাল ডিগ্রিধারীদের ক্ষেত্রে বয়সসীমা ৪০ থেকে বাড়িয়ে ৪৩ বছর করা হয়েছে।
এর ফলে আরও বেশি বয়সী প্রার্থীরা সরকারি চাকরির প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে শুধু বয়সসীমা বাড়ানোর কারণে সরকারি চাকরির প্রতি এই বিপুল আগ্রহ তৈরি হয়েছে, এমনটি বলা যায় না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে ৩০ লাখের বেশি মানুষ এই পরীক্ষায় আবেদন করেছেন। এটি কর্মসংস্থান সম্পর্কে তরুণদের পছন্দ ও অগ্রাধিকারে একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
তবে বিপুলসংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকের কর্মসংস্থানের চাহিদা পূরণ করার মতো সক্ষমতা চীনের সরকারি প্রশাসনের নেই। যোগ্য প্রার্থীর সংখ্যা যেখানে ৩৪ লাখেরও বেশি, সেখানে শূন্যপদের সংখ্যা ৩৬ হাজারের নিচে। ফলে এই পরীক্ষা বৃহত্তর কর্মসংস্থান সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একটি সীমিত সুযোগ মাত্র।
এই তীব্র প্রতিযোগিতার আরেকটি নেতিবাচক দিকও রয়েছে। অনেক প্রার্থী সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতিতে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর ব্যয় করছেন। এর ফলে তাঁদের বাস্তব কর্মক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অর্জন কিংবা নতুন শিল্প খাতের উপযোগী দক্ষতা বিকাশের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।
চীনের সরকারি চাকরির পরীক্ষাকে ঘিরে এই বিপুল প্রতিযোগিতা তাই একই সঙ্গে একটি সংকটের প্রতিফলন এবং ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা। এটি তরুণদের স্থিতিশীল কর্মসংস্থানের সন্ধানে নেওয়া যৌক্তিক সিদ্ধান্তের প্রতিচ্ছবি। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে অর্থনীতির সীমাবদ্ধতাও সামনে নিয়ে এসেছে।
বেসরকারি খাতে নিয়োগের গতি না বাড়লে এবং নতুন শিল্প খাতগুলো ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হলে সরকারি চাকরির জন্য প্রতিবছরের এই তীব্র প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
চীনের তরুণদের কাছে সরকারি চাকরির এই আকাঙ্ক্ষা তাই শুধু নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদার অনুসন্ধান নয়; এটি দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতার মধ্যকার ব্যবধানেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।