Skip to main content

Brick Lane News

ব্রিটেনে অভিবাসনের স্রোত :নীল দরিয়ার ওপাড়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

ব্রিটেনে অভিবাসনের স্রোত :নীল দরিয়ার ওপাড়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

নুজহাত নূর সাদিয়া 

ওরে নীল দরিয়া , আমায় দেরে দে ছাঁড়িয়া সাগরের ফেনিল ঢেউয়ের মূহুমূহু গর্জন, উড়ন্ত গাঙচিলের তীক্ষ্ম আর্তনাদ কোথায় যেন এক অনি:শেষ শূন্যতা-অবিশ্রাম হাহাকার । আবার মাঝ নদীতে খেয়া পারাপারের মাঝির আগমন, জলযানে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে অনিশ্চয়তার পথে যাত্রী একদল দিক ভ্রান্ত পথিক। পথিক তুমি পথ হারাইও না, বহুল চর্চিত প্রবাদটি নিত্যসঙ্গী । তবে, বুভুক্ষু হৃদয়ের আরোহীদের পক্ষে কি সম্ভব হয় সেই অতি কাঙ্খিত ডাঙ্গায় তরী ভেড়ানোর। একটু একটু করে পুঞ্জীভূত রঙ্গিন স্বপ্নগুলোকে বাস্তবের সাদা-কালো দুনিয়ায় বর্ণময় করে তোলার। কালের সাক্ষী লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী টাওয়ার ক্লক , পেন্ডুলামের কাঁটা দোদুল্যমান অধিবাসী নামক সে শেকড় ছেঁড়া মানুষগুলো ও আশা -ভরসার এক টানটান জীবনদড়ির উপর নিজ জীবনের জুয়াবাজিতে মগ্ন। কখনো উচ্চাভিলাস , কখনোবা দালালের খপ্পড়ে আর বড় অংশই পরিবার নামক সে অনতিক্রম্য বৈষয়িক দায়িত্ব পালনে নিরুপায় হয়ে ভিনদেশে পাড়ি জমায় । কাশফুলের আলতো ছোঁয়া , শরতের হিমেল হাওয়া সমুদ্রের অতল জলের আহবান ইউরোপের বরফাচ্ছাদিত প্রকৃতি ,রুপান্তরের এই সময়টুকু স্বাভাবিকভাবেই অনাবাসীদের কাছে অনুকুল । গ্রীষ্মের শেষ, জুনের শেষভাগ আর রসালো স্ট্রবেরি ঘরে তোলার শেষ মৌসুম -কুয়াশা ঢাকা ভোর অথবা গোধূলির পড়ন্ত বেলায় সমুদ্রের কিনারা জুড়ে সারি সারি নৌকার পালের আগমন। মাঝ সাগরে ভাসমান ডিঙ্গি নৌকা, প্রবল দুলুনির মাঝে ও ক্লান্ত বিপর্যস্ত চেহারাগুলোয় বুভুক্ষু চোখগুলো সরব! একটু পেছন ফিরি,চলতি বছরের অক্টোবর মাস পর্যন্ত অনাহুত অতিথিদের আগমনের মোট সংখ্যাটি ২০,৯৩৫ জন যা গতবছরের তুলনায় শতকরা ৪২ ভাগ কম । ২০২৫ সালে বহিরাগত ভিনদেশীদের সংখ্যাটি রীতিমত চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মত; মোট ৩২, ১৮৮ জন। মহামারীর ক্রান্তিকাল , দু:সাহসের সীমারেখা তো বর্ডার লাইন অতিক্রম করবেই, হয়েছে ও তাই। ২০২২ সালে অকূল পাথারে ডুবন্ত ডুবুরীর সংখ্যাটি প্রায় ৪০,০০০ এর অধিক । হয়তবা, জীবনযুদ্ধ হতে পালিয়ে বেড়ানো মানুষগুলো আবার ও নতুন জীবনের দোরগড়ায় কড়া নাড়তে প্রস্তুত হয়েছিল। ক্ষমতাসীন লেবার সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে নি:সন্দেহে সরকারের অগ্রগতি লক্ষণীয় । মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ডামাডোল, তবে ক্ষণস্থায়ী ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটের পরিবর্তিত রাষ্ট্রপ্রধানগণ বেশ শক্ত হাতেই পররাষ্ট্রনীতি সামলে চলেছেন। জাতীয় পরিসংস্থান অফিসের হিসেব অনুযায়ী চলতি ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ব্রিটেনে আগত মোট অধিবাসী ৮,১৩,০০০ জন আর গ্রেট ব্রিটেন কে বিদায় জানানো পরদেশীদের সংখ্যা ও নেহাত কম নয় ৬,৪২,০০০ জন! বৈশ্বিক অর্থনীতির টানাপোড়েন , চাকরির বাজারের সংকুচিত সুযোগ আর করের বোঝা প্রতিষ্ঠিত পেশাদারদের কপালের ভাঁজ বাড়ছে বই কমছে কি? মানবাধিকারের দেশ ইংল্যান্ড, রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থীর সংখ্যা কি আর কম হতে পারে -চলতি ২০২৬ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত হোম অফিসের তথ্য অনুযায়ী অ্যাসাইলাম আবেদনকারীর সংখ্যা মোট ৮৫,৮৯১ জন। অনাবাসীদের সরকার বলে খ্যাত লেবার দল, তবে সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত তাদের পররাষ্ট্র নীতি; মোট ৪০,৪০৫ জন মানুষকে তাদের স্বপরিচয়ে ফিরে যেতে বাধ্য করেছে হোম অফিস কর্তৃপক্ষ। অদম্য সাতারু ব্রজেন দাসের স্মৃতি বিজড়িত ইংলিশ চ্যানেল, বিপজ্জনক এই চ্যানেল হাসিমুখে পার করা ঠিক চাট্টিখানি কথা নয়। লেবারের পররাষ্ট্রনীতির দিক পরিবর্তন, ডিঙ্গি নৌকার আরোহীদের আগ্রহের আতিশয্যে ভাটা! চলতি ২০২৬ সালে আগত শরণার্থীদের সংখ্যা শতকরা প্রায় ৪৩ ভাগ কমে গেছে। ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোট সে তরী, ডিঙ্গি নৌকার আসন গাড়ার স্থান পর্যাপ্ত। মাথাপিছু, গড়ে ৬৪ জন শরণার্থী এ ভাসমান আবাসের যাত্রী। ২০২১ সাল পরবর্তী সময়ে তা হয়েছে দ্বিগুণ। অপরিণামদর্শীতার ফলাফল ও দু:খজনক, বিগত ২০২৪ সালে ইউএন‘র প্রতিবেদন অনুযায়ী মোট ৮৪ জন মানুষ অতল জলের আহবানে চিরদিনের মত হারিয়ে গেছে। এই বিশাল ভূগোলকে দু‘টি দেশের নাম আজ পৃথিবী বাসির মুখে সর্বাধিক উচ্চারিত এবং আলোচিত । সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা, ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে সমালোচিত ট্রাম্প, পাগলাটে আর অদ্ভুতুড়ে ধ্বংসাত্নক কার্যকলাপের শেষ যে কোথায় তা দিকভ্রান্ত মানবজাতির এখন পর্যন্ত বোঝার উপায় নেই। আর অপরদিকে মুগ্ধতার যে শেষ নেই-প্রাচীন পারস্যগাঁথা হতে খোমেনির সাহসিকতা ও বীরত্বে সমৃদ্ধ ইরান । রনাঙ্গনের বীরদের ও যে মাতৃভূমি ত্যাগে প্রস্তুত থাকতে হয়,বিগত ২০২৫ সালে ডিঙ্গি আরোহী আগত মোট পারসিয়ান ৩৬৫৭ জন। শীর্ষে জ্বলজ্বলকৃত নামটি ইরিট্রিয়ার ( মোট ৫৮৭৫ জন), লড়াইরত আফগানি আর সুদানিয়ানরা ও পিঁছিয়ে নেই ( ৪০৪২ ও ৪১৯১ জন)। সংগ্রামরত সোমালিয়ানদের চেষ্টার কথা না বললেই যে নয়; ব্রিটেনে নানা খাতে অবদান রেখে চলা এ মুসলিম দেশটি হতে আগত শরণার্থীদের সংখ্যা মোট ৩৯০১ জন। রাজনৈতিক পট পরিবর্তন, আন্তকোন্দল স্বজন হয়ে পড়ে পর। ব্রিটেন বরাবরি অ্যাসাইলাম আবেদনকারিদের স্বর্গরাজ্য হিসেবে বিবেচিত। নানা দেশের হেভিওয়েট রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের চিরাচরিত জীবনের হাসিমাখা ছবিগুলো যে মেফেয়ার , কোভেন্ট গার্ডেন কিংবা বাংলার আবহে ঘেরা ব্রিকলেনের সুস্বাদু খাবারের স্বাদ আস্বাদনে , শখের স্মারক সংগ্রহে কিংবা কোন আনুষ্ঠানিক সভার প্রকাশনায় আমরা দেখতে পাই। চলতি ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত ব্রিটেনে আগত ৮৯,০৮৯ জন অ্যাসাইলাম আবেদনকারী। যার মাঝে ,শতকরা ১৬ ভাগ মানুষ (১৬,০২১) জন শরণার্থী হোটেলে অবস্থান করছে। সরকার কর্তৃক প্রত্যাখাত অ্যাসাইলাম আবেদনকারির সংখ্যাটি ও উল্লেখযোগ্য , প্রায় ৯০, ৩৩১ জন। টুকরো নুড়ি পাথর আর পোকায় খাওয়া শীষ সরিয়ে পরিচ্ছন্ন গম কে ব্রাইটন বাসীর আহারের প্লেটে তুলে দিতে নতুন বার্নহ্যাম সরকার যে আপ্রাণ চেষ্টারত তা বলা বাহুল্য । পুরনো বন্ধুপ্রতীম দেশ ফ্রান্স, ধমনীতে নীল রক্ত প্রবাহমান । আর্ন্তজাতিক বিবাদ বনাম আভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে বিপর্যস্ত ম্যাখুর সরকার, তবে অভিবাসন নীতিতে বড় ধরণের চমক কি এসেছে । গভীর অর্থবহ এই প্রশ্নটির উত্তর আপাতত না ; একের বদলা এক প্রাচীন এ নীতিটি দু প্রতিবেশি রাষ্ট্রের কূটনীতিতে আজ ও বহাল তবিয়তে বিদ্যমান । ওয়ান ইন , ওয়ান আউট এ ব্যবস্থাপনায় এখন পর্যন্ত ফরাসী দেশে প্রত্যাবর্তনকারির সংখ্যা চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত ১০৮৭ জন । বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যাম, ম্যানচেস্টার সিটির নগর পিতাটিকে দায়িত্ব নেওয়ার পর হতেই নানামুখি পদক্ষেপে সোচ্চার হতে দেখা গেছে । তবে, স্ত্রী সহ নানা আর্থিক অনিয়মে (বিশেষ করে , বিখ্যাত ম্যানচেস্টার সিটি ইউনাইটেড ফুটবল ক্লাবের আর্থিক অনিয়ম তো এক বিশাল বিষফোঁড়া ) নাম জড়ানোর পাশাপাশি যে বিষয়টি তাঁকে বারবার আলোচনার টেবিলে সহকর্মী হতে আমজনতার আলাপের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে তা পূর্বতন লন্ডন মেয়র জনসনের ব্রেক্সিট বিচ্ছেদ হতে ফিরে আসার নতুন কার্যকরী উদ্যোগ । বাস্তবতার নিরিখেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে পূরনো কূটনৈতিক সর্ম্পক স্থাপনে তৎপর চটপটে রাজনীতিবিদটি । কিন্তু, চলমান সংঘর্ষের যে উত্তাপটি ফ্রান্স ছাঁড়িয়ে ইতালি, স্পেনে ছড়িয়ে পড়েছে তার সুদূর প্রসারী আঁচ যে ব্রিটেনে ও আছড়ে পড়তে পারে তা দূরদর্শী সরকার প্রধানটি বেশ ভালভাবেই অনুধাবনে সক্ষম হয়েছেন। ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশি আর ইংলিশ চ্যানেলের ঘূর্ণায়মান স্রোত চলতি ২০২৬ সাল পর্যন্ত মোট ১,৩৯,২৮৮ জন শরনার্থী পা রেখেছে ইউকে, গ্রীস , ইটালি , স্পেন এবং সাইপ্রাসে। ইউনাইটেড নেশনসের প্রতিবেদন অনুযায়ী , ২০১৫ সাল অবধি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া ডিঙ্গি আরোহীদের সংখ্যাটি রীতিমত বিস্ময়কর! প্রায় ১ মিলিয়ন ছাঁড়িয়ে গেছে। রাজকন্যার অপেক্ষায় স্পেনবাসী , ট্রাম্প প্রশাসন কে বুড়ো আঙ্গুল দেখানো সাহসী দেশটি আথিতেয়তার কাতারে সর্ব্বোচ ্ স্থান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে; সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আগত শরণার্থী স্প্যানিশ রণতরীর দখলে মোট ১,৩৩,৭৯৫ জন, পিজ্জার দেশ বর্ষণমুখর ইটালিতে তা দাঁড়িয়েছে ১,২৪,৭৪০ জন আর ফরাসি সৌরভে ঘ্রাণে বিমোহিত খেঁটে খাওয়া মানুষের সংখ্যাটি নেহাত মন্দ নয় ১,১১,৩২০ জন। অন্যান্য ২৬টি ইউরোপীয় দেশের প্রতিদিনের জীবনকাহিনীর প্লটগুলো ও নিত্য নতুন বাস্তব কাহিনীর যোগান দিয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত । জীবনযাত্রার এক অসম টানাপোড়েন , জীবিকা নির্বাহের পথগুলো ক্রমশ এআই নামক চতুর আক্রমণে সংকুচিত হয়ে পড়ছে গোঁদের উপর বিষফোঁড়ার মত এ বাড়তি মানুষের উপস্থিতি- গোটপোস্টে প্রায় ৫ শতাধিক মানুষের অ্যান্টি-মাইগ্রেশন বিক্ষোভ বহুদিন ধরে বিরাজমান এক অস্বীকৃত সিস্টেমের বিরুদ্ধে প্রকাশিত পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বই আর কিছুই নয় । বারে বারে মধ্যপ্রাচ্যে ফিরে যেতে হয়, বাংলার রাজস্ব বাংলার অর্থনীতির চাকা সবযে ঐ ঘাম ঝরানো মানুষগুলোর আয়ের উপর নির্ভরশীল । তবে, বেশ কয়েকবার পবিত্র মক্কা-মদিনা নগরীতে পা রাখা এ আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে এতটুকু বোধগম্য নয় প্রায় তিন তিনটি বছর দু‘জন মানুষ কিভাবে কারাগারের অতল প্রকোষ্ঠে মাথা খুঁড়ে মরেন বিন্দুমাত্র আত্নপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না পেয়ে ? লক্ষাধিক হাজীর পদভার আর সিসিটিভি ক্যামেরার তীক্ষ্ম চোখ কি করে ঘটে এমন সংবেদনশীল ঘটনা-হায় সিথি নজরুল ! দূর দেশে আছি আমি মন পড়ে আছে ঘরে, হাজার মানুষের ভিড়ে একা আমি নিজের ভেতরে -যে স্বপ্ন আর বিশাল আশা নিয়ে অসংখ্য বাসত্মুহারা মানুষ এই তুষারাচ্ছন্ন দেশে পাড়ি জমায় নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত দীর্ঘমেয়াদি ১৫ বছরের (ইনডিফিনিট লিভ ) কি তার নতুন সংস্কার করতে পারবে নাকি বছরের পর বছর চক্রাকারে ঘুরতে থাকা অসংখ্য মানুষকে ইউরোপের থিতু হওয়ার সুখ স্বপ্নকে দীর্ঘায়িত করবে? পিএম বার্নহ্যাম ব্রিটিশবাসী যে থিতু হওয়ার অপেক্ষায় ।