বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের পাশাপাশি এর অপব্যবহার নিয়ে জনমনে ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে জালিয়াতি, ব্যক্তিগত হয়রানি এবং শিশুদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন ধরনের অপতৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় সরকার এই ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, একটি স্বার্থান্বেষী মহল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে দেশে-বিদেশে সক্রিয় হয়েছে। তারা নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলের পক্ষে জনমত তৈরির উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর তথ্য, বানোয়াট সংবাদ এবং ছবি প্রচার করছে। বিশেষায়িত সাইবার স্কোয়াড বা ‘বট বাহিনী’র মাধ্যমে এসব অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানিয়েছে।
নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের মতে, এই কর্মকাণ্ড দেশের সার্বভৌম নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী ও শিল্পীদের চরিত্রহনন এবং সুনাম ক্ষুণ্ন করার যে অপপ্রয়াস চলছে, তা মোকাবিলায় গোয়েন্দা নজরদারি ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্বজুড়েই এআইয়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রযুক্তিবিদ ও গবেষকদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। অ্যানথ্রপিক ও গুগল ডিপমাইন্ডের মতো প্রতিষ্ঠান সতর্ক করেছে যে, দ্রুত বিকাশমান এআই ব্যবস্থা মানবজাতির জন্য অস্তিত্বের সংকট তৈরি করতে পারে। চলতি মাসের শুরুতে ওপেনএআইয়ের প্রধান বিজ্ঞানী ইয়াকুব পাচোস্কি এআইয়ের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে কঠোর হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়া ১৩০০ জন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সম্প্রতি একটি খোলা চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরির রাশ টানতে আন্তর্জাতিক প্রশাসনিক উদ্যোগের সমর্থন চেয়েছেন।
বাংলাদেশেও এআইয়ের কারণে সৃষ্ট ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে আইনি পদক্ষেপের বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, দেশে ডিজিটাল অপরাধের ধরন দ্রুত পাল্টাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে পুলিশ সদর দপ্তর, ডিএমপি এবং রেঞ্জ পর্যায়ে আধুনিক সাইবার নিরাপত্তা ইউনিট ও গবেষণাগার স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এর আগে ১৭ মার্চ ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত ‘গ্লোবাল ফ্রড সামিট’-এ তিনি এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে সাইবার নিরাপত্তা আইনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছিলেন।
সালাহউদ্দিন আহমদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বে প্রায় ৪৪ শতাংশ অপরাধ সাইবার পরিসরে ঘটছে। তিনি বলেন, জালিয়াতি, যৌন হয়রানির উদ্দেশ্যে ব্ল্যাকমেইল এবং সামাজিক ও ধর্মীয় শৃঙ্খলা বিনষ্টকারী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে কার্যকর আইনি কাঠামোর কোনো বিকল্প নেই। এ ছাড়া তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেনের সঙ্গে আলোচনার সময় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রেখে সাইবার প্ল্যাটফর্মে ভুল তথ্য ও অপপ্রচার রোধে সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মুহাম্মদ কাদের গনি চৌধুরী অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অশ্লীলতা ও হয়রানির বিষয়টি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে যে কোনো ব্যক্তির সম্মানহানি করা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হতে পারে না। একই সঙ্গে তিনি প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগে সতর্ক থাকা এবং কোনো সরকারি সংস্থা যাতে নাগরিকদের সাইবার অধিকার লঙ্ঘন না করে, সেই দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো ও কাজের গতি ত্বরান্বিত করতে নানা খাতে এর ব্যবহার বাড়ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অ্যানথ্রপিকের আশঙ্কা, এআই এমনকি সমগ্র মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করার কাজে ব্যবহার হতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ ছাড়া এআই-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্তত ১ হাজার ৩০০ জন গুরুত্বপূর্ণ কর্মী সম্প্রতি এক খোলা চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরির রাশ টানতে প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণে আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে সমর্থন দেওয়ার আহ্বান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি তৈরি হচ্ছে উল্লেখ করে তাঁরা তা প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এআইয়ের কারণে সৃষ্ট ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে তারা প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর কঠোর প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, সন্ত্রাসবাদ, মাদক, মানবপাচার, দুর্নীতি ও আর্থিক জালিয়াতির বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করায় বাংলাদেশ এআইভিত্তিক অপরাধ শনাক্তকরণ ও আইন প্রয়োগের সক্ষমতা জোরদার করছে।