দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও অস্থিরতার পর আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাচ্ছে সিরিয়া। দেশটিতে একের পর এক নতুন রুট চালু, আঞ্চলিক বিমানবন্দর পুনরায় সচল এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে বেসামরিক বিমান চলাচল খাত এখন ঘুরে দাঁড়ানোর পথে। দামেস্ক ও আলেপ্পোর মতো প্রধান কেন্দ্রগুলোর বাইরে এখন দেশটির পূর্বাঞ্চলেও বিমান যোগাযোগের পরিধি দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।
২০২৫ সালের মার্চ মাসে আলেপ্পো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সংস্কারকাজ শেষে পুনরায় কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর থেকেই আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলোর ফেরার প্রক্রিয়া জোরদার হয়। জর্ডান, রোমানিয়া, অস্ট্রিয়া, গ্রিস, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, কুয়েত, সৌদি আরব, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলোর সঙ্গে পুনরায় আকাশপথের সংযোগ স্থাপিত হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের এয়ারলাইন্সগুলো সিরিয়ার বাজারে নতুন করে আগ্রহ দেখাচ্ছে। গত ১০ জুলাই এয়ার আরাবিয়া দামেস্কে পুনরায় ফ্লাইট চালু করে। এর ছয় দিন পর এমিরেটস দুবাই-দামেস্ক রুটে তাদের কার্যক্রম শুরু করে, যা ২০১২ সালে স্থগিত হওয়ার আগে প্রায় ২৫ লাখ যাত্রী পরিবহন করেছিল।
২০২৬ সালে বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও গতি পেয়েছে। ১৪ জুন ইতিহাদ আবুধাবি-দামেস্ক রুটে নিয়মিত ফ্লাইট চালু করে। একই সময়ে জাজিরা এয়ারওয়েজ কুয়েত-আলেপ্পো রুটে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে। দীর্ঘ ১৪ বছরের বিরতি কাটিয়ে ২৯ জুলাই জার্মানির লিয়াভ এভিয়েশন ডুসেলডর্ফ থেকে দামেস্কে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করে। সিরিয়ার আকাশসীমা ব্যবহারের হারও নাটকীয়ভাবে বেড়েছে; কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মার্চ মাসে মাত্র ৩২টি বিমান চলাচল করলেও এপ্রিল মাসে তা বেড়ে ২ হাজার ৫২৩টিতে উন্নীত হয়। দামেস্ক ও আলেপ্পো বিমানবন্দরে ১২টি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়া এর অন্যতম প্রধান কারণ।
অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ধরণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে কর্তৃপক্ষ। আলেপ্পোর বিদ্যমান বিমানবন্দর সম্প্রসারণের কাজ ২০২৭ সালের শুরুতে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে, যার লক্ষ্য বার্ষিক যাত্রী সক্ষমতা ২০ লাখ ছাড়িয়ে নেওয়া। পাশাপাশি, একটি নতুন আলেপ্পো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা প্রাথমিক পর্যায়ে বছরে ৬০ লাখ এবং পরবর্তীতে ১ কোটি ২০ লাখ যাত্রী সামলাতে সক্ষম হবে। এছাড়া দামেস্কের মেজ্জেহ বিমানবন্দরকে সীমিত আকারে বেসামরিক ও নির্বাহী বিমান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সিরিয়ার পূর্বাঞ্চলের বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। ৫ আগস্ট দেইর ইজোর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পুনরায় চালু হওয়ার পর সিরিয়ান এয়ারলাইনস ও জাজিরা এয়ারওয়েজ সেখানে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে। ১ সেপ্টেম্বর জার্মানির লিয়াভ এভিয়েশন কোলন থেকে দেইর ইজোরে সরাসরি সেবা চালু করেছে। একইসঙ্গে কামিশলি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সংস্কারকাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে, যা হাসাকা প্রদেশকে জাতীয় নেটওয়ার্কের সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত করবে।
সৌদি আরবের সঙ্গে বিমান চলাচল সংক্রান্ত সহযোগিতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ৭ সেপ্টেম্বর রিয়াদে সিরিয়ার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা ফ্লাইনাসের প্রধান নির্বাহীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে ‘ফ্লাইনাস সিরিয়া’ নামে একটি নতুন সাশ্রয়ী বিমান সংস্থা গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই সামগ্রিক প্রক্রিয়া সিরিয়ার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নতুন রুটের ফলে ইউরোপ ও উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থানরত সিরীয়দের জন্য দেশে ফেরা সহজ হয়েছে, যা দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা কমিয়ে ব্যয়বহুল ট্রানজিট নির্ভরতা দূর করছে। সেই সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও পর্যটনের নতুন দুয়ার উন্মোচিত হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে সিরিয়ার আকাশসীমা দিয়ে মাত্র ৩২টি বিমান চলাচল করলেও এপ্রিল মাসে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৫২৩-এ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সিরিয়ার বিমান যোগাযোগ পুনরুদ্ধার শুধু পরিবহন খাতের পুনর্গঠন নয়, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রুটগুলো পুনরায় চালুর মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়া এখন সিরিয়ার সামগ্রিক বিমান যোগাযোগ নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনের দিকে এগোচ্ছে।