Skip to main content

Brick Lane News

ব্রিকলেন জামে মসজিদ  ৫০ বছরে এক কমিউনিটির ইতিহাস

ব্রিকলেন জামে মসজিদ ৫০ বছরে এক কমিউনিটির ইতিহাস

 

জুয়েল রাজ –

একটি পুরোনো ভবন। তিন শতাব্দীর ইতিহাস। আর গত ৫০ বছরে ব্রিটিশ বাংলাদেশি মুসলিম কমিউনিটির উত্থানের এক জীবন্ত সাক্ষী, লন্ডনের ব্রিকলেন মসজিদ।

লন্ডনের পূর্ব প্রান্তের ব্রিকলেন ও ফোরনিয়ার স্ট্রিটের কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা ব্রিকলেন জামে মসজিদকে শুধু একটি মসজিদ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত ইতিহাস ধরা পড়ে না। এই ভবনের দেয়ালের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পূর্ব লন্ডনের অভিবাসনের দীর্ঘ ইতিহাস, বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বসতি, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম এবং শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটির শিকড় গেড়ে ওঠার কাহিনী।।

দুইদিনব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে , মসজিদ হিসেবে ঐতিহাসিক মসজিদের ৫০ বছর উদযাপন করছে ব্রিকলেন মসজিদ কতৃপক্ষ । অর্ধশতাব্দী তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বার্ষিকী নয়, পূর্ব লন্ডনে বাংলাদেশি মুসলিম সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ যাত্রাপথেরও স্মারক।

 

ব্রিকলেন মসজিদের ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে উঠে আসে কয়েক শতকের ইতিহাস , যে ইতিহাস শুরু হয়েছিল আমাদের আজকের বাংলাদেশি কমিউনিটির ও বহু আগে।১৭৪৩-৪৪ সালে ফ্রান্সে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে ইংল্যান্ডে আশ্রয় নেওয়া ফরাসি প্রোটেস্ট্যান্ট হুগেনটরা স্পিটারফিল্ডস এলাকায় বসতি স্থাপন করেন। রেশম শিল্পে দক্ষ এই অভিবাসীরা পূর্ব লন্ডনের অর্থনীতি ও জনজীবনে তখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। নিজেদের ধর্মীয় প্রয়োজনের জন্য তাঁরা নির্মাণ করেছিলেন ‘La Neuve Église’, অর্থাৎ নিউ চার্চ।

ভবনের পাথরের সানডায়ালে খোদাই করা লাতিন বাক্য ‘Umbra Sumus’, যার অর্থ ‘আমরা নিছক ছায়া মাত্র’, আজও সেই প্রাচীন ইতিহাসের স্মারক।

পরবর্তী সময়ে এলাকার জনসংখ্যা ও সামাজিক কাঠামো পরিবর্তিত হলে ভবনটির ধর্মীয় পরিচয়ও বদলায়। উনিশ শতকের শুরুতে এটি মেথডিস্টদের উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরে পূর্ব ইউরোপ থেকে আসা ইহুদি অভিবাসীদের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ১৮৯৭-৯৮ সালের দিকে ভবনটি সিনাগগে রূপান্তরিত হয় এবং Machzikei Hadath বা Spitalfields Great Synagogue হিসেবে ইহুদি সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেনে দক্ষিণ এশিয়া থেকে অভিবাসন বাড়তে থাকে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, আজকের বাংলাদেশ বিশেষ করে সিলেট অঞ্চল থেকে আসা বহু মানুষ কাজ ও উন্নত জীবনের সন্ধানে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান।সত্তরের দশকে পূর্ব লন্ডনে বাংলাদেশি উপস্থিতি দ্রুত দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। Tower Hamlets, Whitechapel ও Spitalfields এলাকায় গড়ে উঠতে থাকে নতুন বাংলাদেশি বসতি।

প্রথম প্রজন্মের এসব অভিবাসীর জীবন ছিল কঠোর পরিশ্রম ও নানা প্রতিকূলতায় ভরা। পোশাক ও বস্ত্রশিল্প, কারখানা, রেস্তোরাঁ এবং ছোট ব্যবসায় কাজ করে তাঁরা জীবিকা শুরু করেন। অনেকের জন্য ব্রিটেন ছিল সম্পূর্ণ নতুন এক পৃথিবী। ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক পরিবেশ ছিল অপরিচিত।এই বাস্তবতায় নিজের মানুষের কাছে থাকার প্রয়োজন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।আর সেই প্রয়োজন থেকেই গড়ে ওঠে একটি শক্তিশালী কমিউনিটি।

একসময় ইহুদি জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ পূর্ব লন্ডন থেকে অন্য এলাকায় চলে যাওয়ার পর ঐতিহাসিক ভবনটি মুসলিম কমিউনিটির প্রয়োজনে গ্রহণ করেন।১৯৭৬ সালে ভবনটি মসজিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় ,শুরু হয় আরেক নতুন অধ্যায়ের। যে ইতিহাস পাড়ি দিলো ৫০ বছর।

বাংলাদেশি মুসলিম অভিবাসীদের জন্য এটি শুধু নামাজের জায়গা নয়। এটি ছিল তাঁদের নতুন জীবনের একটি পরিচিত ঠিকানা। এখানে মানুষ নামাজ পড়েছেন, সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষা দিয়েছেন, বিয়ে ও জানাজার মতো সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছেন এবং পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।নতুন কোনো বাংলাদেশি লন্ডনে এলে তার জন্য মসজিদ ছিল পরিচিত মানুষের কাছে পৌঁছানোর অন্যতম দরজা।এভাবেই ব্রিক লেন জামে মসজিদ ধীরে ধীরে একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে কমিউনিটির গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কেন্দ্রে পরিণত হয়।

ব্রিকলেন মসজিদের মূল গুরুত্বটা , অন্য জায়গায় শুধু প্রার্থনার জায়গায় না থেকে বাঙালিদের জন্য হয়ে উঠেছিল যাপিত জীবনের নির্ভরতার স্থান।

সত্তর ও আশির দশকে ব্রিকলেন ও আশপাশের এলাকায় বাংলাদেশি ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকে। রেস্তোরাঁ, গ্রোসারি, ছোট দোকান ও অন্যান্য ব্যবসার পাশাপাশি তৈরি হয় বিভিন্ন কমিউনিটি সংগঠন।এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে ছিল ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো। মসজিদ মানুষকে একত্র করেছে, আর সেই সামাজিক সংযোগ থেকেই তৈরি হয়েছে বৃহত্তর কমিউনিটি নেটওয়ার্ক।

একজন আত্মীয়কে কাজ খুঁজে দেওয়া, নতুন আসা পরিবারকে বাসস্থানের সন্ধান দেওয়া, কোনো বিপদে পাশে দাঁড়ানো, সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া কিংবা পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করা, এসবের মধ্য দিয়েই একটি অভিবাসী সমাজ ধীরে ধীরে সংগঠিত হয়েছে।ব্রিক লেন জামে মসজিদ সেই সংগঠিত হওয়ার প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

 

বাংলাদেশি কমিউনিটির এই উত্থানের পথ সহজ ছিল না। সত্তরের দশকে পূর্ব লন্ডনে বর্ণবাদী হামলা ও বৈষম্য ছিল একটি কঠিন বাস্তবতা। সেই কঠিন সময় মোকাবেলায় ও ব্রিকলেন মসজিদ কমিউনিটিকে নির্ভরতা দিয়েছে।

১৯৭৮ সালে তরুণ বাংলাদেশি পোশাক শ্রমিক আলতাব আলী বর্ণবাদী হামলায় নিহত হন। তাঁর হত্যাকাণ্ড পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি কমিউনিটিকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন।এই আন্দোলন ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। নিজেদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় কমিউনিটির ঐক্য আরও দৃঢ় হয়।আজ Altab Ali Park এবং সেখানে থাকা শহীদ মিনারের প্রতিরূপ সেই ইতিহাসের স্মৃতি বহন করছে।

এখানে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি এবং ব্রিটেনে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশি কমিউনিটির সংগ্রাম যেন একই ইতিহাসের দুটি অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সময়ের সঙ্গে ব্রিকলেন হয়ে ওঠে ব্রিটিশ বাংলাদেশি পরিচয়ের অন্যতম দৃশ্যমান প্রতীক। বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ, দোকান, বাংলা ভাষার সাইনবোর্ড, খাবার, পোশাক এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এই এলাকার আলাদা পরিচয় তৈরি করে।‘Banglatown’ নামটি সেই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।

বাংলাদেশিরা এখানে শুধু বসবাস করেননি, তাঁরা এলাকার অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতেও নিজেদের জায়গা তৈরি করেছেন। বাংলা নববর্ষ বৈশাখী মেলা ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক আয়োজন সেই পরিচয়কে আরও দৃশ্যমান করেছে।একসময় যারা ছিলেন নতুন অভিবাসী, কয়েক দশকের মধ্যে তাঁরাই হয়ে উঠেছেন পূর্ব লন্ডনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

প্রথম প্রজন্মের বাংলাদেশিদের কাছে মসজিদ ছিল নতুন দেশে ধর্মীয় ও সামাজিক নিরাপত্তার একটি জায়গা। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উত্তরাধিকার ও পরিচয়ের প্রশ্ন।আজ ব্রিকলেন জামে মসজিদে নিয়মিত নামাজের পাশাপাশি মাদ্রাসা, হিফজুল কোরআন, নিকাহ, জানাজা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

অর্থাৎ, ৫০ বছর পরও মসজিদটির ভূমিকা শুধু অতীতের স্মৃতি সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ নয়। নতুন প্রজন্মকে ধর্মীয় শিক্ষা, মূল্যবোধ এবং কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত রাখার দায়িত্বও এটি বহন করছে।

এই ৫০ বছরে অনেক কিছু বদলেছে। বদলেছে ব্রিকলেন। বদলেছে পূর্ব লন্ডন। বদলেছে বাংলাদেশি কমিউনিটির জীবনযাত্রা। প্রথম প্রজন্মের শ্রম ও সংগ্রামের ওপর দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্ম আজ ব্রিটিশ সমাজের নানা ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে।কিন্তু শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্কের প্রয়োজন শেষ হয়নি।বরং প্রজন্ম বদলের সঙ্গে সেই সম্পর্কের ধরন আরও নতুন হয়েছে।ব্রিক লেন জামে মসজিদ সেই শিকড়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা হয়ে আছে।

 

ফরাসি হুগেনটদের উপাসনালয় থেকে মেথডিস্ট চ্যাপেল, সেখান থেকে ইহুদি সিনাগগ, আর ১৯৭৬ সাল থেকে বাংলাদেশি মুসলিমদের মসজিদ।একই ভবন বহু সম্প্রদায়ের প্রার্থনা ধারণ করেছে।কিন্তু গত ৫০ বছরের ইতিহাস বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সময় ভবনটি শুধু একটি মসজিদ হয়ে ওঠেনি, এটি ব্রিটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটির বিকাশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে।

সিলেট ও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা অভিবাসীদের নতুন জীবনের শুরু, তাঁদের ধর্মীয় অনুশীলন, সন্তানদের শিক্ষা, সামাজিক বন্ধন, বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং ব্রিটিশ সমাজে নিজেদের জায়গা তৈরি করার দীর্ঘ পথচলায় এই মসজিদ একটি নীরব সাক্ষী।আজ তাই ব্রিক লেন জামে মসজিদের ৫০ বছর পূর্তি কেবল একটি বার্ষিকী নয়।এটি একটি প্রজন্মের শ্রমকে স্মরণ করার দিন।একটি কমিউনিটির সংগ্রামকে সম্মান জানানোর দিন।নতুন প্রজন্মের কাছে উত্তরাধিকার তুলে দেওয়ার দিন।আর সেই সঙ্গে ফিরে দেখার দিন, কীভাবে পূর্ব লন্ডনের একটি ঐতিহাসিক ভবন গত অর্ধশতাব্দীতে ব্রিটিশ বাংলাদেশি মুসলিম জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

তিন শতাব্দীর পুরোনো একটি ভবনের ইতিহাসে গত ৫০ বছর হয়তো একটি অধ্যায় মাত্র। কিন্তু ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের জন্য এটি একটি পুরো প্রজন্মের ইতিহাস।ব্রিক লেন জামে মসজিদ সেই ইতিহাসেরই জীবন্ত ঠিকানা।

(তথ্যসূত্র – অনলাইন সোর্স থেকে নেয়া )