নিজস্ব প্রতিবেদক, ব্রিকলেন নিউজ:
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার তথাকথিত গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সুযোগ নিয়ে শেরপুর জেলা কারাগারে ব্যাপক ভাঙচুর ও হামলার ঘটনা ঘটে। সে সময় কারাগার থেকে পালিয়ে যায় বিপুলসংখ্যক বন্দি। ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো ওই ঘটনার ৩৪৫ জন পলাতক কয়েদিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পলাতক এই আসামিদের মধ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এবং হত্যা মামলার আসামিরাও রয়েছে, যা স্থানীয় জনমনে গভীর নিরাপত্তা শঙ্কার জন্ম দিয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের দিন বিকেলে শেরপুর জেলা কারাগারে দুর্বৃত্তরা হামলা চালায়। বিক্ষুব্ধ হামলাকারীরা কারাগারের মূল ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং অস্ত্রাগার লুট করে। এই বিশৃঙ্খলার সুযোগে কারাগারের ৫ শতাধিক বন্দি পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা এবং কিছু বন্দির স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণের কারণে বেশ কয়েকজনকে কারাগারে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও, একটি বড় অংশ এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।
অধরা আসামিদের নিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ঝুঁকি
দীর্ঘ দুই বছর ধরে ৩৪৫ জন দাগি ও সাধারণ অপরাধীর সমাজের মূল স্রোতে আত্মগোপন করে থাকাটা স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে পলাতক থাকা এসব আসামি নতুন করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, পলাতক আসামিদের মধ্যে অনেকেই এলাকায় ফিরে এসে গোপনে অবস্থান করছে বা ছদ্মবেশে চলাফেরা করছে বলে তাদের সন্দেহ। এর ফলে যেকোনো সময় চুরি, ছিনতাই বা প্রতিহিংসামূলক অপরাধ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পুলিশ ও প্রশাসনের চ্যালেঞ্জ
পলাতক কয়েদিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকলেও বেশ কিছু কাঠামোগত ও ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে:
ভুল ঠিকানা: অনেক কয়েদি কারাগারে প্রবেশের সময় যে ঠিকানা দিয়েছিল, তা ভুয়া বা অসম্পূর্ণ।
প্রযুক্তির ব্যবহার এড়ানো: দাগি অপরাধীরা মোবাইল ফোন বা ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার থেকে বিরত থাকছে, ফলে প্রযুক্তিগত নজরদারির মাধ্যমে তাদের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
পার্শ্ববর্তী দেশে পালিয়ে যাওয়ার শঙ্কা: শেরপুর জেলাটি ভারতের সীমান্তবর্তী হওয়ায় অনেক পলাতক কয়েদি সীমান্ত পার হয়ে প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিয়ে থাকতে পারে বলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ধারণা করছে।
আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, একটি জেলা কারাগার থেকে এত বিপুলসংখ্যক কয়েদির দীর্ঘ সময় ধরে পলাতক থাকা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য একটি অশনিসংকেত। শুধু পুলিশ নয়, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত অভিযান ছাড়া এই আসামিদের গ্রেপ্তার করা প্রায় অসম্ভব। পাশাপাশি, লুট হওয়া অস্ত্রগুলো পুরোপুরি উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত এই ঝুঁকি বহুগুণ বেশি থাকবে।
শেরপুর কারাগার থেকে পলাতক কয়েদিদের গ্রেপ্তারে দুই বছরেও আশানুরূপ অগ্রগতি না হওয়া প্রশাসনের জন্য একটি বড় ব্যর্থতা হিসেবেই দেখছেন স্থানীয়রা। জনমনে স্বস্তি ফেরাতে এবং আইনের শাসন সুনিশ্চিত করতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পলাতক আসামিদের ধরতে দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান পরিচালনা এবং প্রয়োজনে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) সহায়তা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।