নিজস্ব প্রতিবেদক | ব্রিকলেন নিউজঃ
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অভিভাবক যখন বাস্তবতাকে অস্বীকার করেন, তখন তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ দানা বাঁধাটাই স্বাভাবিক। গতকাল এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ওপর দিয়ে যে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া এবং জলাবদ্ধতার বিপর্যয় গেছে, তাকে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সংসদে কেবল ‘ছোটখাটো ঘটনা’ বলে অভিহিত করেছেন। তার এই বক্তব্যকে দেশের সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবক সমাজ কেবল দায়িত্বজ্ঞানহীনই নয়, বরং ‘নির্লজ্জ মিথ্যাচার’ হিসেবে দেখছেন।
মন্ত্রীর বক্তব্য বনাম বাস্তব চিত্র
১৪ জুলাই আন্দোলন চলাকালীন সময়েও জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী দাবি করেছেন, এইচএসসি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং এর মধ্যে কেবল কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের মাঠে বৃষ্টির পানি জমার মতো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। এমনকি এক শিক্ষার্থীর পোশাক ভিজে যাওয়ায় তাকে পরিবর্তন করার সুযোগ দেওয়ার মতো তুচ্ছ বিষয়কে তিনি বড় করে উপস্থাপন করেছেন।
অথচ মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রথম আলোসহ দেশের শীর্ষ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গতকাল বরিশাল, ময়মনসিংহসহ অন্তত ১১টি জেলায় শিক্ষার্থীরা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে। বুকসমান পানি মাড়িয়ে এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাতে গিয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। অথচ মন্ত্রী এসি রুমে বসে এই ব্যাপক জনদুর্ভোগকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে চালিয়ে দিয়ে নিজের অদূরদর্শিতাকেই প্রকাশ্যে এনেছেন।

ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের চার দফা দাবি
শিক্ষামন্ত্রীর এই অসংবেদনশীল আচরণের পর শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ এখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের দাবিগুলো স্পষ্ট:
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত রাখতে হবে।
যারা গতকাল প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি, তাদের পরীক্ষা পুনরায় গ্রহণ করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ বলে কটূক্তি করার জন্য শিক্ষামন্ত্রীকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে।
এই দাবি না মানলে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ করতে হবে।
জবাবদিহিতার সংকট
মন্ত্রী সংসদে দাবি করেছেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র চার মাস হয়েছে এবং আগের মডারেটরদের করা প্রশ্নেই পরীক্ষা হয়েছে। কিন্তু দায়িত্বভার গ্রহণের পর পরীক্ষা সংক্রান্ত সংকট মোকাবিলার দায় কি কেবলই অতীতের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব? পরীক্ষা চলাকালীন স্টেকহোল্ডারদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগের দাবি করলেও, শিক্ষার্থীদের এই ব্যাপক দুর্ভোগ কেন তার নজরে এলো না, তা এক বড় প্রশ্ন।
শিক্ষার্থীরা এখন আর কেবল পরীক্ষার প্রশ্নভুল বা সিলেবাস নিয়ে আন্দোলন করছে না, তারা এখন শিক্ষামন্ত্রীর নৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যখন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করে, তখন সেই যৌক্তিক দাবিগুলোকে ‘ছোট ঘটনা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া কেবলমাত্র অহংকারেরই বহিঃপ্রকাশ।
পরিশেষে
এইচএসসি পরীক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড তৈরির ভিত্তিপ্রস্তর। সেই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের প্রক্রিয়ায় মন্ত্রীর এই ‘সত্য গোপন’ করার প্রবণতা শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের তীব্রতা প্রমাণ করে যে, তারা আর মিথ্যার বেসাতি সহ্য করবে না। শিক্ষামন্ত্রীর উচিত অনতিবিলম্বে নিজ অবস্থানে থেকে সরে এসে শিক্ষার্থীদের সাথে সংলাপে বসা এবং এই চরম বিপর্যয়ের দায় স্বীকার করা।
তথ্যসূত্র: ১. প্রথম আলো ২. যুগান্তর