রঙিন রথ, দড়ি টেনে ভক্তদের উচ্ছ্বাস, শঙ্খধ্বনি আর কীর্তনের সুরে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। প্রতি বছর আষাঢ় মাসে অনুষ্ঠিত রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবই নয়, এটি ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও। হিন্দুধর্মাবলম্বীদের কাছে এই উৎসবের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ভক্তি, আনন্দ ও উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয় রথযাত্রা।
রথযাত্রার ইতিহাস বহু শতাব্দী পুরোনো। সবচেয়ে বিখ্যাত রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয় ভারতের ওডিশা রাজ্যের জগন্নাথ মন্দিরকে কেন্দ্র করে। ইতিহাসবিদদের মতে, বর্তমান মন্দিরটি ১২শ শতকে গঙ্গ বংশের রাজা অনন্তবর্মণ চোড়গঙ্গ দেব নির্মাণ করেন। তবে জগন্নাথ দেবের উপাসনা এবং রথযাত্রার প্রচলন এরও আগে থেকে ছিল বলে ধারণা করা হয়।
হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, ভগবান জগন্নাথ, তাঁর বড় ভাই বলভদ্র এবং বোন সুভদ্রা বছরে একবার নিজ মন্দির থেকে মাসির বাড়ি, অর্থাৎ গুন্ডিচা মন্দিরে যান। এই প্রতীকী যাত্রাকেই রথযাত্রা বলা হয়। সেখানে কয়েক দিন অবস্থান করার পর তাঁরা আবার মূল মন্দিরে ফিরে আসেন। এই প্রত্যাবর্তন উৎসবকে বলা হয় উল্টো রথ বা বাহুদা যাত্রা।
কেন রথ টানা হয়
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, রথের দড়ি টানাকে অত্যন্ত পুণ্যের কাজ হিসেবে দেখা হয়। ভক্তদের বিশ্বাস, ভক্তিভরে রথ টানলে ঈশ্বরের আশীর্বাদ লাভ করা যায় এবং জীবনের নানা বাধা দূর হয়। যদিও এটি একটি ধর্মীয় বিশ্বাস, এর বৈজ্ঞানিক বা ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।
পুরীর বিখ্যাত তিন রথ
পুরীর রথযাত্রায় তিনটি বিশাল কাঠের রথ তৈরি করা হয়। প্রতি বছর নতুন কাঠ দিয়ে এই রথ নির্মাণ করা হয়।
জগন্নাথের রথ: নন্দিঘোষ
বলভদ্রের রথ: তালধ্বজ
সুভদ্রার রথ: দর্পদলন বা দেবদলন
প্রতিটি রথের উচ্চতা, চাকার সংখ্যা এবং সাজসজ্জা আলাদা। হাজারো কারিগরের পরিশ্রমে প্রতি বছর নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে রথগুলো নির্মাণ করা হয়।

বাংলাদেশেও বহু বছর ধরে রথযাত্রা পালিত হয়ে আসছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় রথযাত্রা উপলক্ষে শোভাযাত্রা, পূজা, কীর্তন এবং প্রসাদ বিতরণের আয়োজন করা হয়। বিশেষ করে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর ভক্তদের উল্লেখযোগ্য সমাগম ঘটে।
সময়ের সঙ্গে রথযাত্রা ধর্মীয় উৎসবের গণ্ডি পেরিয়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে মেলা বসে, স্থানীয় হস্তশিল্প, খেলনা, মিষ্টি ও নানা ধরনের খাবারের দোকান সাজানো হয়। পরিবার-পরিজন নিয়ে উৎসবে অংশ নেন অসংখ্য মানুষ।
রথযাত্রা তাই শুধু ভক্তির প্রকাশ নয়, এটি ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং মানুষের মিলনবন্ধনেরও এক অনন্য প্রতীক।