Skip to main content

Brick Lane News

প্রবাসীদের বীমা দাবি নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা: জীবন বীমা করপোরেশনের গড়িমসি

প্রবাসীদের বীমা দাবি নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা: জীবন বীমা করপোরেশনের গড়িমসি

ব্রিকলেন নিউজ ডেস্কঃ 

বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীদের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তায় গৃহীত সরকারি বীমা প্রকল্প এখন নিজেই বড় ধরনের সংকটের মুখে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গনমাধ্যমসহ ‘এশিয়া পোস্ট’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, জীবন বীমা করপোরেশনে (জেবিসি) দীর্ঘ চার মাসেরও বেশি সময় ধরে প্রায় ৩ হাজার ১৪৬ জন প্রবাসী কর্মীর ১০৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকার বীমা দাবি আটকে আছে। এর মধ্যে বিদেশে মৃত্যুবরণকারী ৯৩১ জন কর্মীর পরিবার তাদের প্রাপ্য ৯৩ কোটি ১০ লাখ টাকা না পেয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে।

সংকট যেখানে

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড ও জীবন বীমা করপোরেশনের মধ্যকার চুক্তির আওতায় এই বীমা সুবিধা পরিচালিত হয়। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো প্রবাসী কর্মী বিদেশে মারা গেলে বা স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করলে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে বীমা দাবির অর্থ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ভুক্তভোগীদের সরকারি দপ্তরে মাসের পর মাস ঘুরতে হচ্ছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০১৯ সালে শুরু হওয়া এই চুক্তিতে ৫ বছর মেয়াদী পলিসির আওতায় এখন পর্যন্ত ৫৭ লাখের বেশি প্রবাসী অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। বিপরীতে কল্যাণ বোর্ড প্রিমিয়াম বাবদ জেবিসিকে পরিশোধ করেছে ৪৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা।

দুই সংস্থার পাল্টাপাল্টি দায়

বীমা দাবি নিষ্পত্তি না হওয়ার পেছনে উভয় সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট।

জীবন বীমা করপোরেশনের দাবি: ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের পক্ষ থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত প্রিমিয়াম বাবদ ২২ কোটি ৮১ লাখ টাকা জমা দেওয়া হয়নি। নিজস্ব অডিট ও তহবিল ব্যবস্থাপনার নিয়মের কারণে বকেয়া পাওনা ছাড়া দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের পর্যবেক্ষণ: বোর্ডের দাবি, তারা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ফাইল পাঠানোর পরও জেবিসি দীর্ঘসূত্রতা করছে।

জেবিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাঈদুর কুতুব জানিয়েছেন, বীমা প্রিমিয়াম থেকে যে আয় হচ্ছে, তার তুলনায় বীমা দাবির চাপ অনেক বেশি। এতে ভবিষ্যতে বড় ধরনের আর্থিক ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা নিরসনে বর্তমান চুক্তির পুনঃমূল্যায়ন জরুরি।

দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য ও অসহায় পরিবার

তহবিল হস্তান্তরের এই টানাপড়েনের সুযোগ নিচ্ছে এক শ্রেণির অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী। ১০ লাখ টাকার বীমা সুবিধা দ্রুত পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই দালালরা অসহায় পরিবারগুলোর কাছ থেকে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিচ্ছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জেলা পর্যায়ের অনেক দপ্তরেও এই চক্রের তৎপরতা রয়েছে। কুমিল্লার এক ভুক্তভোগী জানান, লাশ দেশে আনার পর ঋণের বোঝা মেটাতে বীমার অর্থের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো সুরাহা মিলছে না।

করণীয় ও ভবিষ্যৎ ভাবনা

গত ১ জুলাই আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সভায় ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে আটকে থাকা ৩ হাজার ১৪৬টি দাবি নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দুই সংস্থার ডাটাবেজ লিংকেজ স্থাপন এবং প্রতি তিন মাস অন্তর আর্থিক হিসাব মেলানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, জীবন বীমা করপোরেশন যদি প্রবাসীদের এই বীমা সুবিধা সঠিকভাবে পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়, তবে সরকার বিকল্প হিসেবে নিজস্ব উদ্যোগে নতুন ‘সুরক্ষা স্কিম’ চালু করার কথা বিবেচনা করছে।

প্রবাসীদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় দেশের অর্থনীতি সচল থাকলেও, তাদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারি সংস্থাগুলোর এই দীর্ঘসূত্রতা এবং সমন্বয়হীনতা বর্তমানে বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই সংকটের সমাধান না হলে সরকারের এই মহৎ উদ্যোগের কার্যকারিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে।