Brick Lane News

ছয় দফা আসলে কি ছিল ?

ছয় দফা আসলে কি ছিল ?

ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস উপলক্ষে বিশেষ নিবন্ধ

IMG 9442 ছয় দফা আসলে কি ছিল ?

 

 

 

 

 

অমি রহমান পিয়াল 

ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস আজ। খুব কাছের মানুষ অনুরোধ করলো একটা কিছু লিখতে। বিষয়টা নিয়ে আগে লেখিনি তেমন একটা। তাই ভাবলাম কিছু ঐতিহাসিক দলিলপত্র শেয়ার করা যাক বন্ধুদের সঙ্গে। ছয় দফা কি? এটা আসলে এক কথায় বললে, বাঙালীর মুক্তির সনদ। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য সমান অধিকার চেয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ছয়টি দাবি তুলে ধরেছিলেন তার মূলে ছিলো এই অঞ্চলের স্বায়ত্ব শাসন।

ছয় দফা আসলে এগারো দফার কাটছাট এবং চূড়ান্ত ভার্সন বলা যেতে পারে। মূলত তৃতীয় দফায় দুইটি পয়েন্ট এবং পঞ্চম দফায় পাচটি পয়েন্ট মার্জ করে এগারো দফাকে ছয় দফায় আনা হয়। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনে একযুগ পার করা পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ১৯৬৪ সালের ২৯ মার্চ চাঁদপুরে এক জনসভায় প্রথম বঙ্গবন্ধু ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবনার ভিত্তিতে এই দাবি তোলেন এবং প্রথম ১১ দফা পেশ করেন। এরপর চলতে থাকে তার হয়রানি, রাষ্ট্রদ্রোহিতাসহ নানা মামলায় জেলে ঢোকানো হয়, ছাড়া হয়, আবার গ্রেফতার করা হয়। এর মাঝেই টানা সফরে ময়মনসিংহ, নারায়নগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ গোটা দেশে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ছড়িয়ে দেন বাঙালীর স্বাধীনতা ও সার্বভৌম ক্ষমতা লাভের এই রূপরেখা। আর ভীত আইয়ুবশাহীর দালালেরা ছড়িয়ে দেয় শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের কাছে দেশ বিক্রির ষড়যন্ত্র করছেন।

১৯৬৫ সালের ১ আগস্ট ময়মনসিংহে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় আবারও লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রণয়নের জন্য আন্দোলন শুরু করার জন্য দলকে নির্দেশ দেন বঙ্গবন্ধু। এইবার তার বক্তৃতায় ছয় দফা শব্দটি উচ্চারিত হয় বারবার।

এরপর ১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে সম্মিলিত বিরোধী দলের বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে ছয়দফা উত্থাপন করেন বঙ্গবন্ধু। দফাগুলো হুবহু তুলে দিচ্ছি:
এক. ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনা করত পাকিস্তানকে একটি সত্যিকার ফেডারেশন রূপে গড়িতে হইবে । তাতে পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সরকার থাকিবে। সকল নির্বাচন সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কের সরাসরি ভোটে অনুষ্ঠিত হইবে। আইনসভা সমূহের সার্বভৌমত্ব থাকিবে।
দুই.ফেডারেশন সরকারের এখতিয়ারে কেবলমাত্র দেশরক্ষা ও পররাষ্ট্রীয় ব্যাপার এই দুটি বিষয় থাকিবে। অবশিষ্ট সমস্ত বিষয় স্টেটসমূহের (বর্তমান ব্যবস্থায় যাকে প্রদেশ বলা হয়) হাতে থাকিবে।
তিন.ক) পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুইটি সম্পূর্ণ পৃথক অথচ সহজে বিনিয়োগযোগ্য মূদ্রার প্রচলন করিতে হইবে। এই ব্যবস্থা অনুসারে কারেন্সি কেন্দ্রের হাতে থাকিবে না, আঞ্চলিক সরকারের হাতে থাকিবে। দুই অঞ্চলের জন্য দুইটি স্বতন্ত্র ‘স্টেট ব্যাংক’ থাকিবে।
খ) দুই অঞ্চলের জন্য একই কারেন্সি থাকিবে। এ ব্যবস্থায় মুদ্রা কেন্দ্রের হাতে থাকিবে। কিন্তু এ অবস্থায় শাসনতন্ত্রে এমন সুনির্দিষ্ট বিধান থাকিতে হইবে যাতে পূর্ব পাকিস্তানের মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হইতে না পারে।এই বিধানে পাকিস্তানের একটি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থাকিবে।
চার. সকল প্রকার ট্যাক্স-খাজনা-কর ধার্য ও আদায়ের ক্ষমতা থাকিবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে। ফেডারেল সরকারের সে ক্ষমতা থাকিবে না।আঞ্চলিক সরকারের আদায়ী রেভিনিউ-এর নির্ধারিত অংশ আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে ফেডারেল তহবিলে অটোমেটিক্যালি জমা হইয়া যাইবে।এই মর্মে রিজার্ভ ব্যাংকসমূহের উপর বাধ্যতামূলক বিধান শাসনতন্ত্রেই থাকিবে। এইভাবে জমাকৃত টাকাই ফেডারেল সরকারের তহবিল হইবে।

পাঁচ.ক)দুই অঞ্চলের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পৃথক পৃথক হিসাব রাখিতে হইবে।
খ)পূর্ব পাকিস্তানের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা পূর্ব পাকিস্তানের এখতিয়ারে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানের এখতিয়ারে থাকিবে।
গ) ফেডারেশনের প্রয়োজনীয় বিদেশী মুদ্রা দুই অঞ্চল হইতে সমানভাবে অথবা শাসনতন্ত্রে নির্ধারিত হারাহারি মতে আদায় হইবে
ঘ) দেশজাত দ্রব্যাদি বিনাশুল্কে উভয় অঞ্চলের মধ্যে আমদানী রফতানি চলিবে।
ঙ) ব্যবসা-বানিজ্য সম্বন্ধে বিদেশের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের, বিদেশে ট্রেড মিশন স্থাপনের এবং আমদানী-রফতানী করিবার অধিকার আঞ্চলিক সরকারের হাতে ন্যস্ত করিয়া শাসনতান্ত্রিক বিধান করিতে হইবে।
ছয়. পূর্ব পাকিস্তানে মিলিশিয়া বা প্যারামিলিটারি রক্ষীবাহিনী গঠন করা হইবে।

১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরের সেই বিরোধী দলীয় সম্মেলনে ৭৪০ জন প্রতিনিধি ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে গিয়েছিলেন মাত্র ২১জন। মাওলানা ভাসানীর ন্যাপ এবং এনডিএফ এই সম্মেলন বর্জন করে। বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামী লীগ থেকে গিয়েছিলেন ৫ জন প্রতিনিধি। ছয় দফা উত্থাপনের পর বাকি ৭৩৫ জন প্রতিনিধি তাৎক্ষণিক বিরোধিতা করে প্রস্তাবটি নাকচ করে দেয়। বঙ্গবন্ধু সম্মেলন বয়কট করে তার দলের বাকি চারজনকে নিয়ে ঢাকা চলে আসেন। কিন্তু ততক্ষণে গোটা পাকিস্তান জেনে গেছে বাঙালী কি চায়। বঙ্গবন্ধু কি চান।ঢাকা শহর ছেয়ে যায় ‘বাঁচার দাবি ৬ দফা’ ‘বাঙালীর বাচার দাবি ৬-দফা’ ‘৬-দফার ভিতরেই পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসন নিহিত’ লেখা পোস্টারে।
৮ মে আকস্মিকভাবে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয় এবং একাধিক মামলায় দায়ের করা হয়। ৭ জুন বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য নেতাদের মুক্তির দাবিতে হরতাল আহবান করে আওয়ামী লীগ। এদিন গুলি ও হামলায় মারা যান মনু মিয়াসহ আওয়ামী লীগের দশজন নেতাকর্মী।

ছয় দফার পথ ধরেই আসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, শুরু হয় গণ অভ্যুত্থান, আইয়ুব খানের পতন হয়, মুক্তি পান শেখ মুজিব। এবং তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধী দিয়ে বরণ করে নেয় ছাত্র-জনতা। এরপর একাত্তর আমাদের স্বাধীনতা।

বাঙালীর ইতিহাসে ছয় দফার গুরুত্ব আসলে কতখানি তা অনেকেরই অজানা। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ধারাবাহিক এক গণজাগরণে রূপ দিয়েছিলো এটিকে, যার নির্যাস হয়েই বেরিয়ে এসেছিলো সেই শ্লোগান, জয় বাংলা, জাগো জাগো বাঙালী জাগো। এই আন্দোলন ছিলো অহিংস, কিন্তু রক্ত ঝরেছে প্রচুর। বঙ্গবন্ধু এই গনজাগরণে গান্ধীজির মতো সত্যাগ্রহের ডাক পর্যন্ত দিয়েছেন।

দুটো মজার ব্যাপার উল্লেখ করে লেখাটা শেষ করছি। বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ নেতাদের মুক্তি চেয়ে দাবীনামায় যারা সামিল হয়েছিলো তাদের মধ্যে জামাতে ইসলামীও ছিলো। যদিও তারা ছয় দফাকে বরাবরই ইসলাম বিরোধী এবং বঙ্গবন্ধুকে ইসলামের শত্রু বলে অভিহীত করে গেছে। দ্বিতীয় মজার ঘটনাটি জুলফিকার আলী ভুট্টোর তরফে। ছয় দফা নিয়ে ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে এক বির্তকের আহবান জানালে তিনি বলেন বদ্ধ ঘরে না, চলেন খোলা ময়দানে বিতর্ক করি। ভুট্টো চ্যালেঞ্জ নিলেন, ঠিক হলো পল্টনে ১৭ এপ্রিল পল্টন ময়দানে হবে এই ‘সম্মুখ সমর’। জনতার ভিড় উপচে পড়লো কিভাবে ভুট্টো ছয় দফার দফারফা করেন দেখতে। কিন্তু ভুট্টো এলেন না। …

 

লেখক- মুক্তিযুদ্ধ গবেষক  ও অনলাইন এক্টিভিষ্ট।