প্রখ্যাত সাংবাদিক, কলামিস্ট ,মহান ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যে গান, সেই গানের রচয়িতা লেখক-সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী আজ।
আব্দুল গাফফার চৌধুরী ২০২২ সালের ১৯ মে (সকাল ৬:৪৯ মিনিটে) লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর।
২০ মে তাঁর জানাজার নামাজ শেষে ,শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তাঁর মরদেহ লন্ডনের আলতাব আলী পার্কের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে নিয়ে যাওয়া হয়, এরপর প্রবাসী বীর মুক্তিযোদ্ধাদারা আনুষ্ঠানিক ভাবে স্যালুট জানায় ,মুক্তিযুদ্ধের এই শীর্ষ কলম সৈনিককে। যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের তখনকার হাইকমিশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে কফিনে জাতীয় পতাকা ও ফুলের তোড়া দিয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন হাই কমিশনার সৈয়দা মুনা তাসনিম, পরে মুক্তি যোদ্ধা গণ শ্রদ্ধা জানান। ব্রিটেনের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ একে একে মরদেহে শ্রদ্ধা জানান। একে একে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, জাসদ, সিপিবি, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও কমিউনিটি সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ শ্রদ্ধা জানান গাফ্ফার চৌধুরীর কফিনে। তাঁর মরদেহ ২১ মে দুপুর ১:১৩ মিনিটে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে গার্ড অব অনার” প্রদান করা হয়।
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর জন্ম ১৯৩৪ সালের ১২ ডিসেম্বর, বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের উলানিয়া গ্রামে। অষ্টমশ্রেণীতে পড়া সময়ে সিলেটের যুগভেরী পত্রিকায় প্রথম তাঁর লেখা ছাপা হয়।
তার পেশাগত সাংবাদিকতা জীবন শুরু হয় ১৯৪৭ সালে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতা দুর্গা মোহন সেন সম্পাদিত কংগ্রেস হিতৈষী পত্রিকায় কাজ শুরু করেন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি নিয়মিত গল্পও লিখতেন তিনি। ১৯৪৯ সালে সওগাত পত্রিকায় তার প্রথম গল্প ছাপা হয়।
১৯৫৩ সালে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের মাসিক সওগাত পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হন গাফ্ফার চৌধুরী। এ সময় তিনি মাসিক নকীব সম্পাদনা করেন। পরে দিলরুবা হয়ে ১৯৫৬ সালে যোগ দেন দৈনিক ইত্তেফাকে। তিনি এই পত্রিকার সহকারী সম্পাদক পদে নিযুক্ত হন। ওই বছরই তিনি প্যারামাউন্ট প্রেসের সাহিত্য পত্রিকা মেঘনার সম্পাদক হন। ১৯৫৮ সালে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার রাজনৈতিক পত্রিকা চাবুক সম্পাদনার দায়িত্ব পান। কিন্তু কিছুদিন পর সামরিক শাসন জারি হলে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী এরপর দৈনিক আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী, জেহাদ, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা, দৈনিক আওয়াজ ও যুগান্তর পত্রিকায় কাজ করেছেন। মাঝে একবার ইত্তেফাকে ফিরে এলেও ১৯৬৯ সালের ১ জানুয়ারি ইত্তেফাকের সম্পাদক মানিক মিয়া মারা গেলে তিনি আগস্ট মাসে হামিদুল হক চৌধুরীর অবজারভার গ্রুপের দৈনিক পূর্বদেশ-এ যোগ দেন।
১৯৭৪ সালে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী লন্ডনের বাসিন্দা হন। সেখানে নতুন দিন নামে একটি বাংলা পত্রিকা প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে প্রবাস থেকে বাংলাদেশের নানা পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে তিনি পলাশী থেকে ধানমন্ডি নামে একটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন।
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী খ্যাতিমান হয়ে আছেন তার সাহিত্যকর্ম, সাংবাদিকতা আর সেই অবিস্মরণীয় গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’র রচয়িতা হিসেবে।
২০০৯ সালে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী স্বাধীনতা পদক অর্জন করেন। এ ছাড়া তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং একুশে পদক পেয়েছেন।
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ, সহ বাংলাদেশের প্রতিটি দু:সময়ে তাঁর লেখনি তাঁর বক্তব্য শানিত করেছে , পথ দেখিয়েছে বাংলাদেশকে। বিলেতের প্রগতিশীল রাজনীতি, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের কাছে বটবৃক্ষ হয়ে আমৃত্যু ছায়া দিয়ে গেছেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত তাঁর ভক্ত অনুরাগীরা তাঁকে ঘিরে ছিলেন।আজকের দিনে গাফফার চৌধুরীর অভাব ব্যাপক ভাবে বোধ করছেন দেশে বিদেশের বাঙালিরা।
“মহান এই মানুষের চতুর্থ মৃত্যু বার্ষিকীতে ব্রিকলেন পরিবারের পক্ষ থেকে “শোক ও শ্রদ্ধা ” জানাচ্ছি।