গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন বব ব্ল্যাকম্যান এমপি
অভিষেক জিকু-
যুক্তরাজ্যের সিনিয়র পার্লামেন্টারিয়ান বব ব্ল্যাকম্যান সিবিই এমপি হাউস অব লর্ডসে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের সেমিনার “Bangladesh at the Crossroads”–এ বক্তব্য রেখে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা, নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
হাউস অব লর্ডসের কমিটি রুম–৩–এ অনুষ্ঠিত এই সেমিনারের আয়োজন করেন লর্ড রামি রেঞ্জার। অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করে Politika News, Centre for Global Policy and Governance এবং Northampton British Bangladeshi Business Chamber।
২০১০ সাল থেকে হ্যারো ইস্ট আসনের সংসদ সদস্য বব ব্ল্যাকম্যান বর্তমানে কনজারভেটিভ পার্টির প্রভাবশালী ১৯২২ কমিটির চেয়ারম্যান এবং ব্যাকবেঞ্চ বিজনেস কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ২০২৪ সাল থেকে এই দুটি পদে অধিষ্ঠিত।
অনুষ্ঠানের শুরুতে নর্থ্যাম্পটন টাউন কাউন্সিলের কাউন্সিলর নাজ ইসলাম স্বাগত বক্তব্য দেন এবং পুরো সেশনটি সভাপতিত্ব করেন লর্ড রামি রেঞ্জার। এরপর একটি ক্রস-পার্টি আলোচনা ও ইন্টারঅ্যাকটিভ প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়, যা সঞ্চালনা করেন Politika News–এর সম্পাদক-ইন-চিফ তানভীর আহমেদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্যারিস্টার সঞ্জয় কুমার রায়, যিনি Centre for Global Policy and Governance–এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা।
বক্তব্যে বব ব্ল্যাকম্যান যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন। তিনি ১৯৭১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের নেতৃত্বে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যুক্তরাজ্যের সমর্থনের কথা উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা নেতা তাঁর প্রথম দিককার আন্তর্জাতিক সফরের একটি যুক্তরাজ্যে করেছিলেন, যা দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের প্রতীক।
বর্তমান পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে ছাত্র আন্দোলন ও প্রাণহানির ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলের নজর থাকলেও সরকার পরিবর্তনের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশে আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক কাঠামো নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে বাধা, অনুপস্থিতিতে বিচার কার্যক্রম এবং বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের ওপর চাপের অভিযোগের কথা উল্লেখ করেন। নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেকোনো নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে অংশগ্রহণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়া এবং জনগণের আস্থার ওপর। তিনি জনমত জরিপের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের জনগণ এমন রাজনৈতিক দলগুলোকে সমর্থন করে, যাদের বর্তমানে অবাধভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, “যদি রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া না হয়, তবে গণতন্ত্র নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।” তাঁর মতে, বর্জন, নিষেধাজ্ঞা বা রাজনৈতিক বহিষ্কার শেষ পর্যন্ত প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করে।
বব ব্ল্যাকম্যান প্রস্তাবিত একটি সম্ভাব্য গণভোট নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন, যা বাংলাদেশের সাংবিধানিক দিকনির্দেশনায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ভোটারদের ভয়ভীতি বা জোরজবরদস্তির মাধ্যমে প্রভাবিত করার যে কোনো প্রচেষ্টা গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের পরিপন্থী এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব দেশের স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
মানবাধিকার প্রসঙ্গে তিনি হিন্দু, খ্রিস্টান ও সংখ্যালঘু মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার নথিভুক্ত ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। তিনি হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ এবং বাড়িঘর ও উপাসনালয় ধ্বংসের ঘটনাগুলোর কথা তুলে ধরে বলেন, এগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব নয়, বরং বাস্তব ভুক্তভোগীদের নিয়ে প্রামাণ্য ঘটনা।
তিনি যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের নিজ নিজ এলাকার সংসদ সদস্যদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যোগাযোগ করার আহ্বান জানান এবং ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের আরও শক্তিশালী নজরদারি ও কার্যকর ভূমিকার দাবি জানান। বক্তব্য শেষে তিনি সংসদীয় দায়িত্বের কারণে অনুষ্ঠান ত্যাগ করেন এবং সম্মেলনের সাফল্য কামনা করেন।
সেমিনারে সাবেক কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও কমিউনিটি নেতাসহ বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী; ব্রিটিশ বাংলাদেশি চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির উপদেষ্টা ইমেরিটাস শাহাগির বখত ফারুক; ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ওয়েলসের উপাচার্য অধ্যাপক ওসামা খান; অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নাদিরা নাজনিন রাখি; মানবাধিকার আইনজীবী মইনুল ইসলাম মনজু ও মাইকেল মারফি; দ্য ডেইলি স্টার–এর সাংবাদিক আনসার আহমেদ উল্লাহসহ আরও অনেকে।
আলোচনায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, শাসনব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভূমিকা নিয়ে ও আলোচনা হয়।



