জুয়েল রাজ –
আল জাজিরাকে দেয়া সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাক্ষাৎকারে “হাসিনা যুগের সমাপ্তি ” প্রসঙ্গটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তেমনি বিভ্রান্তিও কম নয়। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা কেবল একটি সময় বা পর্বের নাম নন, তিনি একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে।
সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাক্ষাৎকারকে তাই ভবিষ্যৎ রাজনীতির একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা বাস্তবতা হিসেবে নয়। রাজনীতিতে বক্তব্যের চেয়ে বাস্তব সংগঠন, কর্মীদের মনস্তত্ত্ব এবং ক্ষমতার কাঠামো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেসব বিচারে শেখ হাসিনা এখনো আওয়ামী লীগের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক বাস্তবতা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, শেখ হাসিনার রাজনীতি কেবল দলীয় নয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত। উন্নয়ন, অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় তিনি দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় ছিলেন। এই অভিজ্ঞতার বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি করা আওয়ামী লীগের জন্য সহজ কাজ নয়। উত্তরাধিকার প্রশ্নে দলটি এখনো স্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য কোনো কাঠামো দাঁড় করাতে পারেনি। ফলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা যতই হোক, বর্তমান রাজনীতিতে শেখ হাসিনার বিকল্প দৃশ্যমান নয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ শুধু একটি দল নয়। এটি একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, যার শিকড় ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই দীর্ঘ পথচলায় দলটির নেতৃত্ব বারবার বদলেছে, কিন্তু ১৯৮১ সালের পর থেকে শেখ হাসিনা হয়ে উঠেছেন সেই কেন্দ্রবিন্দু, যাকে ঘিরেই দলটি পুনর্গঠিত হয়েছে, ক্ষমতায় ফিরেছে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ফলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি শেখ হাসিনার ব্যক্তিত্ব, সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্বের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে।
এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে আওয়ামী লীগের ভেতরে শক্তিশালী সিনিয়র নেতা আছেন, তাঁদের প্রত্যেকের নিজস্ব বলয় আছে, রয়েছে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত সংগঠকরা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব বলয় শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বকেই কেন্দ্র করে কাজ করে। দলীয় সংকটে, বিভাজনের আশঙ্কায় বা কঠিন রাজনৈতিক মুহূর্তে শেখ হাসিনাই শেষ আশ্রয়। কর্মী-সমর্থকদের আবেগ ও বিশ্বাসের জায়গাটিও সেখানেই গিয়ে থামে। ১৯৯১ সালে জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের পর শেখ হাসিনা দলীয় প্রধান থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। কিন্ত নেতাকর্মীদের না মানার কারণে এক প্রকার তাদের চাপের কারণে সিদ্ধান্ত বদল করতে বাধ্য হয়েছিলেন ,এবং আওয়ামী লীগের হাল ধরেন। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ফিরে আসার বাকী ইতিহাস আমাদের জানা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। সেই সময় থেকে শেখ হাসিনা কার্যত এককভাবেই আওয়ামী লীগকে সংগঠন হিসেবে টিকিয়ে রেখেছেন। কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূলের একেবারে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত দলকে যেভাবে তিনি নিয়ন্ত্রণ ও সংযুক্ত করে রেখেছেন, তা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য। সাংগঠনিকভাবে দুর্বল, চাপগ্রস্ত এবং নানা দিক থেকে কোণঠাসা অবস্থায় থাকা একটি দলকে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রভাবেই সক্রিয় রাখা সম্ভব হয়েছে।
এখানেই শেখ হাসিনার রাজনীতির দ্বৈত অবস্থান স্পষ্ট হয়। আওয়ামী লীগের মতো ঐতিহ্যবাহী এবং বিপুল জনসমর্থন থাকা একটি দলের জন্য শেখ হাসিনা একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় শক্তি এবং সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। শক্তি এই অর্থে যে, তাঁর নেতৃত্ব ছাড়া দলটি এখনো কার্যকরভাবে দাঁড়াতে পারছে না। আবার দুর্বলতা এই অর্থে যে, দলটি এখনো তাঁর বাইরে বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে তুলতে ব্যর্থ।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতীতের ‘মাইনাস ফর্মুলা’ প্রয়োগের ইতিহাস নতুন নয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বলা যায়, শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের কোনো উদ্যোগ কখনোই অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ায় সম্ভব হয়নি। বরং এমন চেষ্টা হলে সেখানে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ অবধারিত হয়ে ওঠে। “হাসিনা যুগের সমাপ্তি” যদি বাস্তবায়নের কোনো প্রচেষ্টা হয়, তবে সেটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক বিবর্তনের মাধ্যমে নয়, বরং কৃত্রিম চাপ ও বাইরের সমীকরণের মাধ্যমেই আসবে। এই বাস্তবতাই অনেককে উদ্বিগ্ন করে।
আওয়ামী লীগের সাত দশকের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতি, সংগঠনের আবেগ এবং কর্মী-সমর্থকদের বিশ্বাসের জায়গাটি এখনো শেখ হাসিনার সঙ্গেই নিবিড়ভাবে যুক্ত। দলীয় সিদ্ধান্ত, ঐক্য রক্ষা কিংবা রাজনৈতিক দিকনির্দেশনায় তাঁর বিকল্প এখনো দৃশ্যমান নয়।
তবে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নেতৃত্বের পরিবর্তন প্রয়োজন। আওয়ামী লীগের ভবিষ্যতের জন্য নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব, নতুন রাজনৈতিক ভাষা এবং নতুন সাংগঠনিক কাঠামো জরুরি। কিন্তু সেই রূপান্তর শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে নয়, বরং তাঁর নেতৃত্বের মধ্য দিয়েই হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা বেশি। ইতিহাস বলে, আওয়ামী লীগ ভেঙে নয়, বরং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে ঘিরেই বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, “হাসিনা যুগের সমাপ্তি” এখনো রাজনৈতিক বাস্তবতার চেয়ে বেশি একটি ধারণা বা আকাঙ্ক্ষা। বাস্তবে শেখ হাসিনাই এখনো আওয়ামী লীগের প্রধান সংগঠক, সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক পুঁজি এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। এই দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই আওয়ামী লীগের রাজনীতি চলছে। আর এই বাস্তবতায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যে কোনো মুহূর্তে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে—এই বিশ্বাস দলীয় কর্মী-সমর্থকদের বড় অংশের মধ্যেই এখনো অটুট।
সব মিলিয়ে বলা যায়, “হাসিনা যুগ” শেষ হয়ে গেছে এমন দাবি এখনো সময়ের আগেই করা। আওয়ামী লীগের আবেগ, বিশ্বাস ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের সঙ্গে শেখ হাসিনা এখনো গভীরভাবে জড়িয়ে আছেন। এই সংকটকালে তাঁকে বাদ দিয়ে দল ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, এমন বিশ্বাসের জায়গায় আওয়ামী লীগের বড় অংশ এখনো পৌঁছায়নি। তাই আলোচনার ঝড় থাকলেও বাস্তব রাজনীতিতে শেখ হাসিনা এখনো প্রাসঙ্গিক।
তবে এটাও সত্য যে সময় থেমে থাকে না। আওয়ামী লীগের মতো পুরনো দলে প্রজন্মগত পরিবর্তন অনিবার্য। নতুন নেতৃত্ব, নতুন ভাষা ও নতুন কৌশল ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু সেই রূপান্তর হঠাৎ করে বা আবেগনির্ভর ঘোষণার মাধ্যমে হয় না। সেটি হয় ধীরে, পরিকল্পিতভাবে এবং নেতৃত্বের ছায়াতেই। শেখ হাসিনার উপস্থিতি সেই রূপান্তরের পথে অন্তরায় নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা রক্ষাকবচ ।
লেখক – সাংবাদিক ও কলামিস্ট ,যুক্তরাজ্য ,লন্ডন



