বার্ষিক চাঁদা বকেয়া থাকা এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে জাতিসংঘ ‘অত্যাসন্ন আর্থিক ধসের’ মুখে পড়েছে বলে সতর্ক করেছেন সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে দ্রুত চাঁদা পরিশোধ এবং আর্থিক বিধিবিধানে মৌলিক সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে সব সদস্যরাষ্ট্রকে পাঠানো এক চিঠিতে গুতেরেস বলেন, জাতিসংঘ বর্তমানে ভয়াবহ আর্থিক সংকটে রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশগুলোকে হয় পূর্ণাঙ্গ ও সময়মতো চাঁদা পরিশোধে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে, নয়তো সংস্থাটির আর্থিক পতনের বাস্তব সম্ভাবনা মেনে নিতে হবে।
চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের এক মুখপাত্র বলেন, এখনই চাঁদা পরিশোধের সময়, অন্যথায় পরিস্থিতি আর সামাল দেওয়া যাবে না। জাতিসংঘের উপমুখপাত্র ফারহান হক বলেন, আগের মতো কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার মতো নগদ অর্থ বা তারল্য বর্তমানে সংস্থাটির হাতে নেই।
জাতিসংঘের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মাত্র ৩৬টি দেশ ২০২৬ সালের নিয়মিত চাঁদা সম্পূর্ণ পরিশোধ করেছে। ২০২৫ সালের শেষে বকেয়া চাঁদার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ১৫৭ কোটি ডলারে।
জাতিসংঘের নিয়মিত বাজেটের সবচেয়ে বড় অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র, যা মোট বাজেটের ২২ শতাংশ দেয়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবদানকারী চীন, যার অংশ ২০ শতাংশ। তবে গুতেরেস বকেয়া থাকা কোনো দেশের নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেননি।
এই সতর্কবার্তা এমন এক সময়ে এলো, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বহুপক্ষীয় সংস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন কমানোর পদক্ষেপ নিয়েছেন। চলতি মাসে ট্রাম্প প্রশাসন বেশ কয়েকটি জাতিসংঘ সংস্থা থেকে সরে যাওয়ার পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি ‘বোর্ড অব পিস’ নামে নতুন একটি উদ্যোগ চালু করেছেন তিনি, যা জাতিসংঘকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের জাতিসংঘবিষয়ক পরিচালক লুই শারবোনো বলেন, এই উদ্যোগ কার্যত একটি ‘পে-টু-প্লে’ বৈশ্বিক ক্লাবের মতো, যেখানে স্থায়ী সদস্য হতে ১০০ কোটি ডলার দিতে হবে। তাঁর মতে, এ ধরনের উদ্যোগে অর্থ দেওয়ার পরিবর্তে সরকারগুলোর উচিত জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হওয়া।
আর্থিক সংকট সামাল দিতে জাতিসংঘ ২০২৬ সালের জন্য ৩৪৫ কোটি ডলারের বাজেট অনুমোদন করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ কম। তবু গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী জুলাইয়ের মধ্যেই সংস্থাটির নগদ অর্থ ফুরিয়ে যেতে পারে।
চিঠিতে গুতেরেস আরও বলেন, একটি সেকেলে নিয়মের কারণে প্রতিবছর অব্যবহৃত অর্থ সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে ফেরত দিতে হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। তিনি এই ব্যবস্থাকে ‘কাফকায়েস্ক’ বা অযৌক্তিক ও জটিল চক্র হিসেবে আখ্যায়িত করেন।



