স্টিফেন উত্তম রোজারিও
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে দেশের সবচেয়ে বড় ক্যাথলিক তীর্থযাত্রা ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সাম্প্রতিক সময়ে খ্রিস্টান প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলার ঘটনায় সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে।
প্রতি বছর ফেব্রুয়ারির প্রথম শুক্রবার গাজীপুর জেলার ঢাকার কাছাকাছি সেন্ট নিকোলাস প্যারিশে সেন্ট অ্যান্থনির তীর্থযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। এ বছর তীর্থযাত্রাটি নির্ধারিত হয়েছে ৬ ফেব্রুয়ারি, যা ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের এক সপ্তাহেরও কম সময় আগে।
এই সময়সূচি ক্যাথলিকদের মধ্যে অংশগ্রহণ নিয়ে বিভক্তি তৈরি করেছে, যদিও চার্চ কর্তৃপক্ষ জোর দিয়ে বলছে, এই ধর্মীয় আয়োজনের সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই।
“প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ এই তীর্থযাত্রায় অংশ নেন, ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট উভয়ই। কিন্তু এ বছর পরিস্থিতি ভিন্ন, কারণ নির্বাচন একেবারে সামনে,” বলেন দিনাজপুর ধর্মপ্রদেশের ৪৫ বছর বয়সী ক্যাথলিক মিন্টু বিশ্বাস।
প্রতিবছর পরিবারসহ তীর্থযাত্রায় অংশ নেওয়া মিন্টু বিশ্বাস এ বছর সেখানে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে তাস হিসেবে ব্যবহার করে। তাই আমার মনে ভয় কাজ করছে। সে কারণেই এবার যাচ্ছি না।”
সাম্প্রতিক হামলায় উদ্বেগ বেড়েছে
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক কয়েক মাসে ক্যাথলিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করে সংঘটিত একাধিক সহিংস ঘটনা।
২০২৫ সালের নভেম্বরে ঢাকায় সেন্ট মেরিস ক্যাথেড্রাল এবং সেন্ট জোসেফস হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল অ্যান্ড কলেজে হাতে তৈরি বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। ডিসেম্বর মাসে একটি মুসলিম গোষ্ঠী দুটি স্বনামধন্য ক্যাথলিক কলেজে হুমকিমূলক চিঠি পাঠায়। চিঠিতে “চার্চ, ক্যাথেড্রাল, চ্যাপেল ও মিশনারি প্রতিষ্ঠান”-এ হামলার হুমকি দেওয়া হয়, যদি স্কুলগুলো তথাকথিত ধর্মান্তর কার্যক্রম বন্ধ না করে।
বাংলাদেশে খ্রিস্টানদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার এক শতাংশেরও কম, প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশে তারা একটি ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক অস্থিরতার পর থেকে তাদের নিরাপত্তা শঙ্কা আরও বেড়েছে। ওই সময় ছাত্রদের নেতৃত্বে হওয়া গণবিক্ষোভে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। বর্তমানে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করছে।
তীর্থযাত্রা আয়োজক কমিটির তথ্যমতে, গত বছর প্রায় ৫০ হাজার মানুষ এতে অংশ নিয়েছিলেন এবং এ বছরও একই ধরনের উপস্থিতি আশা করা হচ্ছে।
চার্চ কর্তৃপক্ষ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, গাজীপুর জেলার ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে চিঠি পাঠিয়ে তীর্থযাত্রার বিষয়ে অবহিত করার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানিয়েছে।
ঢাকা আর্চডায়োসিসের একজন জ্যেষ্ঠ পুরোহিত নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই আয়োজন সম্পূর্ণ ধর্মীয়।
তিনি বলেন, “এটি একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান। এর সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা সরকার ও প্রশাসনকে জানিয়েছি, কিন্তু এখনো কোনো জবাব পাইনি।”
সরকারি নীরবতাকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা সরকারের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছি। যদি তারা নিরাপত্তা না দেয়, তাহলে আমাদের স্বেচ্ছাসেবকদের দিয়েই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।”
ঢাকায় কর্মরত ৪১ বছর বয়সী প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান অ্যাভিনাশ সোরেন বলেন, সেন্ট অ্যান্থনির তীর্থযাত্রা বাংলাদেশে খ্রিস্টানদের জন্য একটি ঐতিহাসিক ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ধর্মীয় আয়োজন।
তিনি বলেন, “এই তীর্থযাত্রায় নিরাপত্তা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। আমি আমার পরিবারসহ সেখানে যাব এবং আশা করি সরকার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেবে।”
তিনি আরও বলেন, কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও তীর্থযাত্রা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ক্যাথলিক চার্চ প্রশংসার যোগ্য এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে কোনো বাধা থাকা উচিত নয়।
সরকারের প্রতিক্রিয়া
তীর্থযাত্রা এলাকা সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা জাকির হোসেন ২৮ জানুয়ারি সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে চার্চ কর্তৃপক্ষের পাঠানো চিঠি তিনি পেয়েছেন।
তিনি বলেন, “গতকালই আমি এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানের বিষয়ে চিঠি পেয়েছি। একই সঙ্গে সম্ভবত জেলা পুলিশ সুপার এবং জেলা প্রশাসকের কাছেও চিঠি পাঠানো হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, বিষয়টি এখনো পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে।“আমরা চিঠিটি পর্যালোচনা করছি এবং যেখানে তীর্থযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে সেই এলাকা পরিদর্শন করে নিরাপত্তা পরিস্থিতি যাচাই করছি। এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। সরকার অনুমোদন দিলে অবশ্যই সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে,” বলে জানান তিনি।
(ক্রেডিট: ইউরেশিয়া ভিউস)



