Brick Lane News

দেশে সাংবাদিকতা সর্বগ্রাসী আতঙ্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে: আল–জাজিরাকে মাহফুজ আনাম

প্রকাশিত ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । ৪:৩৪ পিএম

দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেছেন, বাংলাদেশে সাংবাদিকতা এখন এক ধরনের সর্বগ্রাসী আতঙ্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কোনো গোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া মনোভাব থেকে সামান্য ভিন্ন কিছু বললেও হামলার শিকার হওয়ার আশঙ্কা কাজ করছে।

আল–জাজিরার অনুষ্ঠান ‘দ্য লিসেনিং পোস্ট’-এ দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাহফুজ আনাম বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যম আগের তুলনায় বেশি স্বাধীন এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও বেড়েছে। তবে একই সঙ্গে সাংবাদিকদের মধ্যে একটি গভীর ভয় কাজ করছে, চাপিয়ে দেওয়া বয়ান থেকে সামান্য সরে গেলেই আক্রমণের মুখে পড়তে হতে পারে।

তিনি বলেন, অনেক সময় শব্দ চয়নেও সাংবাদিকদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয়। কোন শব্দ ব্যবহার করা হবে বা হবে না এই দ্বিধা স্বাধীন গণমাধ্যম সংস্কৃতির পরিপন্থী হলেও বর্তমান বাস্তবতায় সেটাই করতে হচ্ছে।

ডেইলি স্টার ভবনে হামলার প্রসঙ্গ তুলে মাহফুজ আনাম বলেন, যারা ভবনে আগুন দিয়েছে, তারা ডেইলি স্টারের পাঠক নয়। তাঁর মতে, হামলাটি ছিল সুপরিকল্পিত এবং এর পেছনে রাজনৈতিক ও আর্থিক উদ্দেশ্য ছিল। পাশাপাশি গণতন্ত্র, বহুমতের স্বীকৃতি এবং ভিন্নমতকে সমর্থনকারী উদার সাংবাদিকতার ঐতিহ্য ধ্বংস করাও হামলাকারীদের লক্ষ্য ছিল।

তিনি বলেন, প্রতিবেদনে ভুল থাকলে তা নিয়ে সমালোচনা হতে পারে, কিন্তু একটি গণমাধ্যম পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।

হামলার রাতটিকে ‘চরম আতঙ্কের’ রাত হিসেবে বর্ণনা করে মাহফুজ আনাম বলেন, ভবনের ভেতরে আটকে পড়া কর্মীদের শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল। ফোনে কথা বলার সময় তারা বলছিল, হয়তো আর দেখা হবে না। অনেকেই সেই রাতে বাবা–মা, স্ত্রী ও বন্ধুদের ফোন করে শেষবারের মতো কথা বলেছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রসঙ্গে মাহফুজ আনাম বলেন, মতপ্রকাশের সুযোগ বাড়লেও এর ফল হিসেবে ভুয়া খবর, ঘৃণামূলক বক্তব্য ও ভিত্তিহীন অভিযোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের প্রবণতা বাংলাদেশেও একটি বাস্তবতা হয়ে উঠেছে, যার সুযোগ কিছু রাজনৈতিক দল সংগঠিতভাবে নিয়েছে।

তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে কিছু বললেই হঠাৎ শত শত মানুষ গালি দিতে শুরু করে, আবার পক্ষে বললে প্রশংসায় ভরে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এমন রাজনৈতিক ব্যবহার এখন খুবই সাধারণ ঘটনা।

ডেইলি স্টার সম্পাদক বলেন, হামলার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন ইনফ্লুয়েন্সার প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘প্রথম আলো ডান, ডেইলি স্টারে চলে আসেন।’ তাঁর মতে, এটি ছিল দুটি প্রভাবশালী মূলধারার গণমাধ্যমকে পরিকল্পিতভাবে হেয় করার একটি কার্যকর কৌশল।

গণমাধ্যমের রাজনীতিকরণ নিয়ে মাহফুজ আনাম বলেন, বছরের পর বছর ধরে সাংবাদিক সমাজ রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। কেউ একটি দলের সঙ্গে, কেউ আরেক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকায় গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, যে সাংবাদিকের দায়িত্ব সত্য বলা, তার কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকা পাঠক ও দর্শকের আস্থাকে দুর্বল করে দেয়।

আসন্ন জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে মাহফুজ আনাম বলেন, টানা তিনটি নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার পর জনগণ এখন চতুর্থটির দিকে এগোচ্ছে। এবার মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি এবং সবাই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে চায়।

তিনি বলেন, যেই নির্বাচিত হোক না কেন, তাদের শেখ হাসিনার পতনের কারণ মনে রাখতে হবে। তাঁর পতনের অন্যতম কারণ ছিল সরকারের দমনমূলক চরিত্র এবং গণমাধ্যমের প্রতি আচরণ।

হাসিনা শাসনামলের শেষ ১৫ বছরকে সংক্ষেপে বোঝাতে গিয়ে মাহফুজ আনাম বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনই সেই সময়ের প্রতীক। এই আইন ভিন্নমতের ওপর সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকে স্পষ্ট করে এবং ভয়ের পরিবেশ তৈরির উদ্দেশ্যেই করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামান্য পোস্টের জন্য গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে কার্টুনিস্ট ও শিক্ষক গ্রেপ্তার থেকে শুরু করে শীর্ষ সম্পাদকীয় কণ্ঠগুলোর বিরুদ্ধে বিচারিক হয়রানি পর্যন্ত করা হয়েছে।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে মাহফুজ আনাম বলেন, শেখ হাসিনা তাঁর বিরুদ্ধে ৮৩টি মামলা করেছেন। প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার অভিযোগ আনা হয়। বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়ায় ডেইলি স্টারের আয় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। তাঁর কোনো প্রতিবেদককেই কখনো প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠান কাভারের অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং সংসদে দাঁড়িয়ে তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা হয়েছে।

শেষে মাহফুজ আনাম আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যৎ সরকারগুলো এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেবে এবং বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী ও মুক্ত গণমাধ্যমের পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

Related Posts

ঝড়ো বাতাসে উত্তাল পদ্মা, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরি চলাচল বন্ধ

ঝড়ো বাতাসে উত্তাল হয়ে উঠেছে পদ্মা নদী। বৈরী আবহাওয়ার কারণে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ...

Read more

সর্বশেষ খবর

অন্যান্য ক্যাটাগরি