ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার শিয়ালধরা বাজারে অগ্রণী ব্যাংকের একটি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকের নাম ব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে গ্রাহকদের জমানো টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় স্থানীয়রা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। ইতিমধ্যে অভিযুক্ত আউটলেট ব্যবস্থাপক মাজহারুল ইসলাম ওরফে সোহেল মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন বলে জানা গেছে।
২০২০ সালে শিয়ালধরা বাজারে অগ্রণী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং (অগ্রণী দুয়ারি ব্যাংকিং) কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। তবে নানাবিধ অনিয়ম ও অসংগতির কারণে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালের ২১ জুন আউটলেটটির কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। অভিযোগ রয়েছে, বন্ধের পরও কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের কাছে বিষয়টি গোপন রাখে এবং ব্যাংকের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে প্রতারণা অব্যাহত রাখে। পরবর্তীতে ১৮ আগস্ট কালিগঞ্জ শাখার কর্মকর্তারা সরেজমিনে গিয়ে সাইনবোর্ডটি অপসারণ করেন। ২০২০ সালের জুনে কার্যক্রম শুরু করা এই আউটলেটে প্রায় ২ হাজার ৮০০ গ্রাহক ছিলেন।
ভুক্তভোগী গ্রাহকদের দাবি, তারা ব্যাংকিং সেবার ওপর আস্থা রেখে কষ্টার্জিত অর্থ জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু টাকা ফেরত চাইতে গেলে তাদের ভয়ভীতি দেখানো হয়। উদং মধুপুর গ্রামের শোভা খাতুন আক্ষেপ করে জানান, গার্মেন্টসে চাকরি করে জমানো ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেছিলেন ছেলের লেখাপড়ার কথা ভেবে। এখন তিনি জানতে পেরেছেন, তার জমানো টাকার কোনো বৈধ নথি ব্যাংকের মূল সার্ভারে নেই এবং তার কাছে থাকা রসিদগুলো ভুয়া। পোশাক কারখানায় কাজ করে তিল তিল করে জমা করা ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা সঞ্চয়পত্রে জমা দিয়ে প্রতারিত হয়েছেন উদং মধুপুর গ্রামের শোভা খাতুন। ভেবেছিলাম ছেলের লেখাপড়ায় কাজে লাগবে। এখন শুনছি আমার কোনো টাকাই জমা হয়নি। ”।
প্রতারণার শিকার অন্য গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছেন প্রবাসী সুজন মিয়ার স্ত্রী শামছুন্নাহার, যিনি নতুন ঘর তোলার জন্য পাঠানো ২৪ লাখ টাকা সঞ্চয়পত্রে জমা দিয়েছিলেন। এছাড়া আনসার সদস্য মো. সোহেল মিয়া ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং এক প্রবাসী গ্রাহকের ব্যাংক হিসাব থেকে তার স্ত্রীর অজান্তে ১৭ লাখ টাকা সরিয়ে ফেলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মফিজউদ্দিন নামের আরেক ভুক্তভোগী জানান, জমি ও গরু-ছাগল বিক্রি করে জমানো পৌনে ৫ লাখ টাকা ব্যাংকে নিরাপদ ভেবে রেখেছিলেন, যা এখন পুরোপুরি উধাও। অভিযোগ রয়েছে গ্রাহকদের পারিবারিক সঞ্চয়পত্র ও এফডিআর করার নামে ভুয়া রসিদ দেওয়ার পাশাপাশি গ্রাহকদের অজান্তে ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা উত্তোলন ও স্থানান্তর করা হয়েছে। তার কাছে ব্যাংক ছিল নিরাপদ জায়গা, কারণ বাড়িতে টাকা রাখলে চুরির ভয় ছিল।
ঘটনার পর ভুক্তভোগীরা একত্রিত হয়ে আউটলেটের সামনে সংবাদ সম্মেলন করেন। লিখিত বক্তব্যে জাহাঙ্গীর আলম অভিযোগ করেন, আউটলেট কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের প্রায় কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। ভুক্তভোগীদের তালিকা অনেক দীর্ঘ; যার মধ্যে শামসুন্নাহারের ২৪ লাখ, জাহাঙ্গীরের ১৪ লাখ এবং পারুল আক্তারের ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ও এফডিআরের টাকা খোয়া যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।
এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের কালিগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান জানান, আউটলেটটি বন্ধ হওয়ার সময় সেখানে প্রায় ১ কোটি ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকার আমানত ছিল। তিনি স্পষ্ট করেন যে, এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে সঞ্চয়পত্র ইস্যু বা এফডিআর খোলার কোনো দাপ্তরিক অনুমোদন নেই।
আউটলেটের স্বত্বাধিকারী মো. মাজহারুল ইসলাম ওরফে মিজান দাবি করেন, তার আউটলেটে সঞ্চয়পত্র ইস্যুর অনুমতি ছিল না এবং তিনি নিজে এসব অনিয়মের বিষয়ে অবগত নন। তিনি সব দায়ভার ব্যবস্থাপক সোহেলের ওপর চাপিয়েছেন। জানা গেছে, ঘটনার তদন্ত করছে সিআইডি এবং পলাতক সোহেলের বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও হয়েছে।
নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত জানিয়েছেন, ভুক্তভোগীদের অভিযোগ পাওয়ার পর ব্যাংক ব্যবস্থাপককে তলব করা হয়েছিল। জনগুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন।