৭ আগস্ট ২০২৬ সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। চুক্তিতে বলা হয়, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে সেটিকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র এক মাসের মাথায়, ৮ সেপ্টেম্বর হুথিরা সেই প্রতিশ্রুতির প্রথম পরীক্ষা নেয়। তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ে আবহা, খামিস মুশাইত, জাজান ও নাজরান শহরে হামলা চালায়। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, এসব হামলায় জ্বালানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অন্তত ৭৩ জন আহত হন। হুথিরাও দাবি করে, তারা আরামকো স্থাপনা ও কিং খালিদ বিমানঘাঁটিসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
হামলার পরপরই পাকিস্তান মক্কা চুক্তির প্রতি তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে। একই সময়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর আসে, রিয়াদ অনুরোধ করলে ইসলামাবাদ হুথিদের অবস্থানে বিমান হামলা চালাতে পারে। কিন্তু ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাংবাদিকদের জানায়, সামরিক জবাব দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। শুধু বলা হয়, প্রয়োজন হলে পাকিস্তান ব্যবস্থা নেবে। তুরস্ক হামলার নিন্দা জানানোর পর কার্যত নীরব হয়ে যায়।
তথাকথিত ‘মুসলিম ন্যাটো’র প্রথম বাস্তব পরীক্ষায় শেষ পর্যন্ত দেখা গেল একটি বিবৃতি এবং চুক্তির ভাষা বদলের ঘটনা। এখন এটিকে কেবল প্রতিরক্ষামূলক চুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে এবং এর বাস্তব সামরিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনাটি অন্তত এতটুকু দেখিয়েছে যে চুক্তিটি অনেকটাই প্রতীকী এবং সৌদি আরবের হয়ে যুদ্ধে জড়ানোর ক্ষেত্রে পাকিস্তানের আগ্রহ খুব সীমিত।
ইসলামাবাদের অবস্থানের এই দ্রুত পরিবর্তন একই সঙ্গে বিস্ময়কর এবং উদ্বেগজনক। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, পারস্পরিক প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয় এবং প্রয়োজন হলে পাকিস্তান তা পালন করবে। একাধিক প্রতিবেদনে পাকিস্তানি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছিল, রিয়াদ অনুরোধ করলে হুথিদের লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলার বিষয়টি ইসলামাবাদ বিবেচনা করছে।
কিন্তু এসব খবর প্রকাশের এক দিনের মধ্যেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খান সেই সম্ভাবনা নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, এমন কোনো পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না এবং জোটকে আরও বিস্তৃত করারও কোনো পরিকল্পনা নেই।
এর আগে খাজা আসিফ নিজেই চুক্তিটি কার্যকরের ক্ষেত্রে কিছুটা জায়গা রেখে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘উসকানি ছাড়া আগ্রাসন’ অথবা ইয়েমেনের সংঘাত সৌদি ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতিতে চুক্তির পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা কার্যকর হবে। এর অর্থ দাঁড়ায়, সৌদি আরবের চারটি শহরে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলেও সেটিকে সেই পর্যায়ের হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। অর্থাৎ, প্রতিশ্রুতির শর্ত হামলার পর নতুন করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কোনো প্রতিশ্রুতি আনুষ্ঠানিকভাবে ভঙ্গ না করেই তা এড়িয়ে যাওয়ার এটি বেশ পরিচিত কৌশল।
এই পরিস্থিতির সুযোগ তৈরি হয়েছে চুক্তিটির ভাষার মধ্যেই। এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসা তথ্য অনুযায়ী, চুক্তিতে যৌথ প্রতিরক্ষার অঙ্গীকার রয়েছে, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট সামরিক পদক্ষেপ, স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া কিংবা তা বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট কাঠামো বাধ্যতামূলক করা হয়নি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তি স্বাক্ষরের এক মাসেরও বেশি সময় পরেও এই প্রতিশ্রুতি কীভাবে বাস্তবে কার্যকর হবে, তার বিস্তারিত পরিষ্কার ছিল না।
বিশ্লেষকেরা আরও বলেছেন, চুক্তিটি ইয়েমেনে হুথিদের দখলে থাকা কোনো ভূখণ্ড পুনর্দখলের জন্য সদস্য দেশগুলোকে বাধ্য করে না। ফলে কোনো সদস্য ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সহযোগিতা করতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো থেকে বিরত থাকতে পারে।
ন্যাটো প্রতিষ্ঠার পর পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গিয়েছিল, তার আগে সংস্থার আর্টিকেল ৫ একবারও প্রয়োগ করা হয়নি। কিন্তু সেই সময়জুড়ে ন্যাটোর ছিল স্থায়ী কমান্ড কাঠামো, নির্দিষ্ট সামরিক বাহিনী ও সদস্যদের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বাহিনী, এবং সম্মত নিয়মকানুন। মক্কা চুক্তি মাত্র ৩২ দিনের মাথায় পরীক্ষার মুখে পড়ে। অথচ ৩১ আগস্ট একটি সচিবালয় ঘোষণার বাইরে তখনও এর তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
পাকিস্তানের অবস্থান শুধু দুর্বলই নয়, পরস্পরবিরোধীও। ইসলামাবাদ একই সময়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির এ বছর ইতোমধ্যে তিনবার ইরান সফর করেছেন এবং এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার পথ তৈরিতেও কাজ করছেন।
সৌদি আরবে হামলার পর পাকিস্তান ইরানকে তার ইয়েমেনি মিত্রদের সংযত করার আহ্বান জানিয়েছে। অর্থাৎ, চুক্তিবদ্ধ সামরিক মিত্রের চেয়ে ইসলামাবাদকে তখন বেশি একজন মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় দেখা গেছে। একদিকে পাকিস্তান যদি ইরানের মিত্রদের ওপর হামলা চালায়, অন্যদিকে একই সময়ে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পথ তৈরিতে সহায়তা করে, তাহলে দুই অবস্থানকে একসঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য করা কঠিন। বাস্তবে ইসলামাবাদ সৌদি আরবের প্রত্যাশা পূরণের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট রাখাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার চাপ। পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে জঙ্গি সহিংসতা এবং জঙ্গিবিরোধী অভিযানে ২,৭০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
এর ওপর ইসলামাবাদ একই সময়ে তিন ধরনের পরস্পরবিরোধী বার্তা দিচ্ছে। সৌদি আরব ও পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ জনমতের সামনে তারা ন্যাটোর মতো যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির কথা বলছে। ইরান পর্যবেক্ষকদের সামনে বলছে, এটি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক এবং এখনো অসম্পূর্ণ একটি কাঠামো, যার কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই। আর বাস্তবে মাঠপর্যায়ে এমন প্রশিক্ষণ ও লজিস্টিক সহায়তা বজায় রাখছে, যা অনেকটা ২০১৫ সালের অবস্থারই ধারাবাহিকতা।
মক্কা চুক্তির অপ্রকাশিত অংশ, হুথিদের হামলার পর কোনো সামরিক প্রতিক্রিয়া না থাকা, জোট সম্প্রসারণ নিয়ে অবস্থান পরিবর্তন এবং চুক্তির পারমাণবিক মাত্রা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, সবই এর স্পষ্ট উদাহরণ। সমস্যাটা পাকিস্তানের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করা নয়। সমস্যা হলো, চুক্তিটি এমনভাবে লেখা হয়েছে যাতে বক্তৃতায় এর কথা বলা যায়, কিন্তু সংকটের সময় তা কার্যকর না করেও পার পাওয়া যায়।
রিয়াদ এর আগেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, কিন্তু মনে হচ্ছে সেখান থেকে যথেষ্ট শিক্ষা নেয়নি। ২০১৫ সালের এপ্রিলে ইয়েমেন অভিযানে সৌদি আরব পাকিস্তানের কাছে যুদ্ধবিমান, স্থলসেনা ও নৌবাহিনীর সহায়তা চেয়েছিল। পাকিস্তানের সংসদ তখন নিরপেক্ষ থাকার সিদ্ধান্ত নেয়, যা দীর্ঘদিনের আর্থিক সহায়তাদাতা সৌদি আরবের জন্য ছিল বিব্রতকর।
এর পর থেকে ইসলামাবাদ রিয়াদের সঙ্গে আরও কয়েকটি চুক্তি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরিত স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট এবং তার ১১ মাস পরের ত্রিপক্ষীয় চুক্তি। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ পাকিস্তান সৌদি আরবে হাজার হাজার সেনা, বিমান, ড্রোন এবং একটি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠিয়েছিল।
২০১৫ সালের প্রত্যাখ্যান এবং ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের অবস্থানের মধ্যে মূল পার্থক্য খুব বেশি নেই। পার্থক্য শুধু একটাই: দ্বিতীয়বারের ঘটনায় একটি স্বাক্ষরিত যৌথ প্রতিরক্ষা ধারা যুক্ত হয়েছে।
সৌদি আরবের শহরগুলোতে হুথিদের হামলার পর তুরস্ক ছিল তুলনামূলকভাবে নীরব অংশীদার, কিন্তু তাতেও খুব বেশি আশ্বাস পাওয়ার কারণ নেই। বিশ্লেষকদের মতে, আঙ্কারা তার প্রতিশ্রুতি বজায় রাখতে চায়, কিন্তু একই সঙ্গে ইয়েমেনের যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়তেও চায় না। তাদের মতে, প্রতিরক্ষা চুক্তিটি মূলত প্রতীকী। উপসাগরীয় অঞ্চলে তুরস্কের বড় ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে, ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্কও জটিল, আর কোনো সক্রিয় সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ইচ্ছা আঙ্কারার নেই।
তাহলে সৌদি আরব বাস্তবে কী পেল?
একটি ছবি তোলার সুযোগ, একটি সচিবালয় এবং এমন দুই অংশীদার, যারা এক মাসের মধ্যেই চুক্তির ফাঁকফোকর খুঁজে নিয়েছে।
সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা এখনো মূলত মার্কিন ব্যবস্থা ও সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে দেশটির জ্বালানি স্থাপনাগুলোও যে ঝুঁকিমুক্ত নয়, হুথিদের হামলা তা আবারও দেখিয়ে দিয়েছে।
যেকোনো প্রতিরক্ষা চুক্তির মূল্য অনেকটাই নির্ভর করে প্রতিপক্ষ সেটিকে কতটা বিশ্বাস করে তার ওপর। হুথিরা মাত্র ৩২ দিনের মাথায় সেই বিশ্বাস পরীক্ষা করে দেখেছে এবং উত্তরও পেয়েছে। মক্কা চুক্তি সম্প্রসারণের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে পাকিস্তানের সরকারি অবস্থানও তাই তাৎপর্যপূর্ণ। কার্যকর কোনো যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফল হলে সাধারণত নতুন সদস্য আকৃষ্ট করে। ব্যর্থ হলে উল্টো সদস্য হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়।
মক্কা চুক্তিকে মুসলিম বিশ্বের যৌথ নিরাপত্তার দিকে একটি পদক্ষেপ এবং ওয়াশিংটনের ওপর কম নির্ভরশীল একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর সূচনা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে যখন সহিংসতা এলো, তখন আঙ্কারা শুধু নিন্দা জানাল, ইসলামাবাদ দুই দিনের মধ্যে তার অবস্থান পাল্টাল এবং দুই দেশই হঠাৎ করে বলতে শুরু করল যে চুক্তিটি সবসময়ই কেবল ‘প্রতিরক্ষামূলক’ ছিল।
সৌদি আরবের উচিত তার অংশীদারদের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা বাস্তবসম্মতভাবে বিবেচনা করা। পাকিস্তান সৌদি অর্থ, বিলম্বিত তেল পরিশোধের সুবিধা এবং পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির মর্যাদা গ্রহণ করবে। কিন্তু যখন ইরানের মিত্রদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রশ্ন আসবে, তখন নিজের স্বার্থ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে পাকিস্তান যুদ্ধে জড়াবে না।
এটি প্রকৃত অর্থে কোনো সামরিক জোট নয়। বরং পশ্চিম এশিয়ায় একটি নতুন নিরাপত্তা বলয় তৈরির অর্ধহৃদয় প্রচেষ্টা বলেই এটিকে বেশি মনে হয়।