Skip to main content

Brick Lane News

সন্তানকে ঢাল বানিয়ে থাকার সুযোগ বন্ধের উদ্যোগ; বহিষ্কারের ঝুঁকিতে ব্রিটেনের অভিবাসীরা

সন্তানকে ঢাল বানিয়ে থাকার সুযোগ বন্ধের উদ্যোগ; বহিষ্কারের ঝুঁকিতে ব্রিটেনের অভিবাসীরা

যুক্তরাজ্যে নিজেদের সন্তানদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধন রয়েছে—এমন অসত্য দাবি তুলে দেশটিতে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ বাগিয়ে নেওয়া অভিবাসীদের দমনে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে ব্রিটিশ প্রশাসন। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ মানবাধিকার আইনের অপব্যবহার করে পারিবারিক পরিচয়ে আশ্রয় দাবি কিংবা দেশত্যাগের আদেশ এড়ানোর পথ বন্ধ করতে নতুন নীতিমালার পরিকল্পনা করেছেন। দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকার গত ৯ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের ৮ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত পারিবারিক জীবনের অধিকারের যেন অপব্যবহার না ঘটে, সে লক্ষ্যে প্রশাসন নতুন এই পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

নতুন এই প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো অভিভাবক তার সন্তানের সঙ্গে ঠিক কতদিন ধরে এবং কী মাত্রায় যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন, বিচারালয়কে এখন থেকে সেই বাস্তবতার নিরিখেই পারিবারিক সম্পর্কের সত্যতা যাচাই করতে হবে। সরকারের মূল উদ্দেশ্য হলো, বহিষ্কারাদেশ এড়াতে কোনো অভিবাসী যেন শেষ মুহূর্তে পরিবারের সঙ্গে থাকা শুরু না করেন অথবা সন্তানের দেখভালের বিষয়টি বাড়িয়ে দেখিয়ে পারিবারিক অধিকারের কার্ড খেলতে না পারেন। তবে মনে রাখতে হবে, প্রস্তাবিত এই সংশোধনীটি বর্তমানে পার্লামেন্টে পর্যালোচনার টেবিলে থাকা ইমিগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম বিলেরই একটি অংশ, ফলে এটিকে এখনই চূড়ান্ত আইন হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

প্রতিবেদনে অতীতে ঘটে যাওয়া কিছু বিতর্কিত ঘটনার প্রসঙ্গ টানা হয়েছে, যেখানে দেখা গেছে—সন্তানদের সঙ্গে দীর্ঘসময় যোগাযোগ না থাকা কিংবা কারাদণ্ড ভোগ করার পরও অনেক অভিবাসী কেবল সন্তান লালন-পালনের যুক্তিতে মানবাধিকার আইনের সুবিধা নিয়ে ব্রিটেনে থেকে যাওয়ার অনুমতি পেয়ে গেছেন। উদাহরণস্বরূপ, আলবেনিয়ার নাগরিক ক্লেভিস দিশার বিষয়টি দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। ৩৯ বছর বয়সী দিশা ভুয়া পরিচয় দিয়ে অবৈধ উপায়ে যুক্তরাজ্যে ঢুকেছিলেন এবং তার আশ্রয়ের আবেদনও খারিজ হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তার আইনজীবীরা যুক্তি দেখান যে, তাকে আলবেনিয়ায় ফেরত পাঠানো হলে কিংবা যুক্তরাজ্যে তার ছেলেকে পিতৃহীন রাখলে শিশুটির ওপর বড় ধরনের মানসিক ও শারীরিক সংকট তৈরি হতে পারে। এমনকি সন্তানের খাবারের পছন্দ, সামাজিক পরিবেশ এবং উদ্বেগের মতো বিষয়গুলোও আদালতে তুলে ধরা হয়। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, অবৈধ আয়ের আড়াই লাখ পাউন্ডসহ গ্রেফতার হয়ে দুই বছর জেল খাটার পরও দিশা পারিবারিক অধিকারকে পুঁজি করে যুক্তরাজ্যে বৈধভাবে থেকে যাওয়ার সুযোগ লাভ করেন।

আলোচ্য ইমিগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম বিলে ব্যক্তিগত পারিবারিক অধিকারের চেয়ে জননিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বিধান অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। তাছাড়া, দেশত্যাগের নির্দেশ আসার পর শেষ মুহূর্তে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া যারা আশ্রয় বা সুরক্ষার আবেদন করবেন, সেই আবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে তাদের বিলম্বের বিষয়টিও আমলে নেওয়া হবে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য থেকে যাদের ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তাদের দেশে অবস্থানের সপক্ষে সমস্ত যুক্তি ও প্রমাণ পেশ করার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হবে। এই মেয়াদের মধ্যে আশ্রয়ের দাবি বা অন্য কোনো সুরক্ষার আবেদনও করতে হবে। নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর কিংবা বহিষ্কারের নোটিশ হাতে পাওয়ার পর নতুন করে কোনো আবেদন করা হলে, সেই বিলম্বের কারণ মূল্যায়ন করা হবে। মানবপাচারের শিকার হওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো ঠিক কোন সময়ে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তাও এই মূল্যায়নের অন্তর্ভুক্ত থাকবে। সরকারের মূল লক্ষ্য হলো বারবার নতুন দাবি পেশের মাধ্যমে দেশত্যাগের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার পথ বন্ধ করা এবং অভিবাসন সংক্রান্ত আপিলগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ মন্তব্য করেছেন যে, দেশের সাধারণ মানুষের মনে এই ভরসা থাকতে হবে যে যুক্তরাজ্যের অভিবাসন প্রক্রিয়াটি নিরাপদ, শৃঙ্খলিত এবং ফাঁকফোকরহীন। তার মতে, প্রস্তাবিত এই সংস্কারগুলো দেশের অভিবাসন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা বজায় রাখবে, এর ভুল ব্যবহার রোধ করবে এবং যাদের দেশটিতে আইনি অধিকার নেই, তাদের দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করবে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, চলতি বছরের জুলাই মাসে হাউস অব কমন্সে বিলটি ১৭৪ ভোটের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফায় পাস হয়েছিল। প্রস্তাবিত এই বিলে আরও বলা হয়েছে, করের টাকায় বিনামূল্যে থাকাখাওয়া ও অন্যান্য সুবিধাভোগী আশ্রয়প্রার্থীরা যখন নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর মতো আর্থিক সচ্ছলতা অর্জন করবেন, তখন তাদেরও এই খরচের একটি অংশ বহন করতে হবে। এই উদ্দেশ্যে সক্ষম প্রাপ্তবয়স্কদের নির্দিষ্ট আয়ের অতিরিক্ত অর্থ থেকে কিস্তির মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১০ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত আদায় করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি, মামলা বা আপিল দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষে একটি স্বতন্ত্র অভিবাসন আপিল কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। তবে সন্তানপ্রীতি, পারিবারিক জীবনের অধিকার এবং আশ্রয়ের নিয়মে আনা এই পরিবর্তনগুলো চূড়ান্তভাবে কেমন রূপ ধারণ করবে, তা পুরোদমে সংসদীয় প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরেই নিশ্চিত হওয়া যাবে।