যুক্তরাজ্যের ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের হাজার হাজার অঞ্চলে কর্মক্ষম বয়সের জনগোষ্ঠীর অর্ধেকেরও বেশি মানুষ বেকার ভাতার ওপর জীবনযাপন করছেন। থিংক ট্যাংক ‘সেন্টার ফর সোশ্যাল জাস্টিস’ (সিএসজে)-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দেশটির সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সিস্টেমে জরুরি সংস্কারের জোরালো দাবি উঠেছে।
সংস্থাটির তথ্যমতে, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে প্রায় ৩ হাজার ৩৬৯টি এমন এলাকা রয়েছে যেখানে কর্মক্ষম বাসিন্দাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই বেকার ভাতার ওপর নির্ভরশীল। প্রতিটি জনপদে গড়ে আড়াইশ মানুষের বসবাস থাকলেও সব মিলিয়ে এই এলাকাগুলোতে প্রায় ৮ লাখ ৬০ হাজার নাগরিকের বসবাস, যা লিডস শহরের জনসংখ্যার প্রায় সমান। এমনকি কিছু নির্দিষ্ট সড়কেও দেখা গেছে যে ৮০ শতাংশ পরিবারই সরকারি ভাতার ওপর টিকে আছে। এছাড়া আরও প্রায় ১৯ হাজার এলাকায় কর্মক্ষম মানুষের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এই সুবিধার আওতায় রয়েছেন, যেখানে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের বসবাস।
সিএসজের প্রতিষ্ঠাতা ও ইউনিভার্সাল ক্রেডিট পদ্ধতির অন্যতম রূপকার স্যার ইয়ান ডানকান স্মিথ মন্তব্য করেছেন যে, বহু ব্রিটিশ নাগরিক দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্রীয় ভাতার বেড়াজালে আটকে গেছেন। তার মতে, শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতার কারণে প্রদত্ত বিশেষ ভাতাসমূহ অনেক সময় কর্মসংস্থানে ফেরার তাগিদ কমিয়ে দেয়। তবে সমীক্ষায় উঠে আসা ভুক্তভোগীদের ব্যক্তিগত বয়ানে দীর্ঘমেয়াদী বেকারত্ব, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও মানসিক অবসাদের মতো বহুমুখী সংকটের চিত্রও স্পষ্ট হয়েছে। শহরাঞ্চলগুলোর মধ্যে বার্মিংহামে এ ধরনের জনপদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি—১৬৬টি। তালিকার পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে লিভারপুল (১১২টি), শেফিল্ড (৮২টি) এবং ব্র্যাডফোর্ড (৮১টি)। অন্যদিকে অনুপাতে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ব্ল্যাকপুল, যেখানকার ১৫ শতাংশ এলাকাই ভাতার ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এছাড়া হার্টলপুলে এই হার ১২ শতাংশ এবং রেডকার অ্যান্ড ক্লিভল্যান্ডে ৮ শতাংশ। লিভারপুল ও বার্মিংহামের যথাক্রমে ২২ ও ১৮ শতাংশ এলাকায় কর্মক্ষম মানুষের অন্তত ৪০ শতাংশই বেকার ভাতা গ্রহণ করেন, বিপরীতে লন্ডনে এই হার মাত্র ২ শতাংশ।
বর্তমানে ইংল্যান্ড, ওয়েলস ও স্কটল্যান্ডজুড়ে প্রায় ৬৭ লাখ মানুষ অন্তত এক ধরনের বেকারত্ব–সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় অনুদান পাচ্ছেন, যা ২০১৯ সালে ছিল মাত্র ৩৯ লাখ। অর্থাৎ, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৫.৮ শতাংশ বা প্রতি ছয়জনে একজন এখন এই ভাতার ওপর নির্ভরশীল। কর্মহীনতার পাশাপাশি চিকিৎসা সংক্রান্ত অনুদান গ্রহণের হারও উল্লেখযোগ্য হারে ঊর্ধ্বমুখী। গবেষণায় দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে অক্ষমতা বা ডিসঅ্যাবিলিটি ভাতা নেওয়ার হার বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৬১ শতাংশ, অথচ একই সময়ে কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে প্রতিবন্ধকতার হার বেড়েছে মাত্র ১৬ শতাংশ। ২০১৯ সাল থেকে প্রায় ১৭ লাখ এমন ব্যক্তি এই সুবিধা ভোগ করছেন যাদের জন্য নতুন করে চাকরি খোঁজা বা কর্মমুখী হওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সিএসজের ২৫০ পৃষ্ঠার ‘স্টেট অব ডিপেনডেন্সি’ নামক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকে স্বাস্থ্যগত কারণে শ্রমবাজার থেকে দূরে থাকার প্রবণতা বহুলাংশে বেড়েছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে যুক্তরাজ্যের সামাজিক কল্যাণ খাতের ব্যয় বেড়ে ১৩ হাজার ৬১০ কোটি পাউন্ডে গিয়ে ঠেকবে বলে অনুমান করা হচ্ছে, যা মহামারির আগের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি।
বার্মিংহামের স্পার্কব্রুকের বাসিন্দা ৪৭ বছর বয়সী কারোল ক্রাভচিক জানান, পাঁচ বছর আগের এক দুর্ঘটনার পর থেকে তার নিয়মিত কর্মসংস্থানের সুযোগ বন্ধ রয়েছে। একসময়ের দক্ষ ওয়েল্ডার ও ফর্কলিফট চালক কারোল শারীরিক চলাচলে অক্ষমতার কারণে পেশাগত জীবনে ফিরতে পারছেন না। পাশাপাশি, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ভাতা বা পিআইপির জন্য দুই দফায় আবেদন করেও তিনি তা পাননি বলে অভিযোগ করেন। একই এলাকার ২৫ বছর বয়সী তরুণ ক্যামেরন লুকাস জানান, মানসিক অসুস্থতার কারণে তিনি কোনো চাকরিতেই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেননি। প্রায় একশটি কর্মসংস্থানের জন্য আবেদন করেও কোনো ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি জানান, বর্তমানে তিনি সম্পূর্ণভাবে ইউনিভার্সাল ক্রেডিটের ওপর নির্ভরশীল।
এদিকে ব্রিটিশ কর্মসংস্থান ও পেনশন মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্রের মতে, দেশের বহু অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী বেকারত্ব একটি স্থায়ী সংকটে রূপ নিয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে অসুস্থতাকে কর্মবিমুখতার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই স্থবিরতা কাটাতে সরকার ইউনিভার্সাল ক্রেডিটের সাধারণ ও স্বাস্থ্যগত ভাতার মধ্যকার ফারাক কমানো, সরাসরি স্বাস্থ্য পরীক্ষা পদ্ধতি পুনরায় চালু করা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে ৩৫০ কোটি পাউন্ড বিনিয়োগের মতো বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। সরকারের উদ্দেশ্য হলো জনবলকে পুনরায় কর্মক্ষেত্রে ফিরিয়ে এনে দেশের কল্যাণমূলক খাতকে দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই করা। তবে সিএসজে মনে করে, ভাতানির্ভরতার এই দুষ্টচক্র ভাঙতে আরও ব্যাপক ও কাঠামোগত সংস্কার আবশ্যক।