Skip to main content

Brick Lane News

এনসিপির ভবিষ্যৎ কোন পথে?

এনসিপির ভবিষ্যৎ কোন পথে?

জুয়েল রাজ, সম্পাদক ও প্রকাশক, ব্রিকলেন নিউজ :

রাজনীতিতে নতুন একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম সবসময়ই মানুষের মনে নতুন আশার জন্ম দেয়। আর সেই দল যদি আসে একটি বড় গণআন্দোলনের ভেতর থেকে, তাহলে প্রত্যাশাটা আরও বেড়ে যায়। জাতীয় নাগরিক পার্টি, এনসিপির ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই হয়েছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সামনে আসা তরুণ নেতৃত্বকে ঘিরে মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল। অনেকেই মনে করেছিলেন, পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাইরে এবার সত্যিই নতুন কিছু হতে যাচ্ছে।কিন্তু সেই এনসিপি আজ কোথায় দাঁড়িয়ে?

দলটি যত দ্রুততার সঙ্গে রাজনীতির মাঠে উঠে এসেছিল, তত দ্রুতই নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বহুত্ববাদ, নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, রাষ্ট্র সংস্কার এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশের কথা বলে যাত্রা শুরু করলেও বাস্তবে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে শুরু থেকেই নানা ধরনের প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয়কেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।রাজনীতিতে জোট হতে পারে, সমঝোতা হতে পারে। কিন্তু সেই সমঝোতার বিনিময়ে একটি নতুন দল যদি নিজের স্বাতন্ত্র্য হারাতে শুরু করে, তখন প্রশ্ন উঠবেই। এনসিপির ক্ষেত্রেও সেই প্রশ্ন এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় যে তরুণদের মুখে বিপ্লব, রাষ্ট্র সংস্কার, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও জনগণের ক্ষমতায়নের কথা শুনেছিলাম, তাদের অনেকের রাজনৈতিক ভাষা এখন বদলে গেছে। বিপ্লবের জায়গায় ক্ষমতার হিসাব, রাষ্ট্র সংস্কারের জায়গায় নির্বাচনী সমীকরণ এবং নতুন রাজনীতির জায়গায় পুরোনো রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে বোঝাপড়ার প্রবণতা দৃশ্যমান।

মানুষ এনসিপির কাছে আরেকটি প্রচলিত রাজনৈতিক দল চায়নি। মানুষ চেয়েছিল বিকল্প। চেয়েছিল এমন একটি রাজনৈতিক শক্তি, যারা ক্ষমতায় যাওয়ার আগে নিজেদের নীতি ও আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু সেই দল যদি শুরুতেই ক্ষমতার অঙ্কে আটকে যায়, তাহলে মানুষের হতাশ হওয়াটাই স্বাভাবিক।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সাংগঠনিক কর্তৃত্ব নিয়ে নানা টানাপোড়েনের খবর সামনে এসেছে। গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কেউ দল ছেড়ে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ছেন, কেউ আবার নিজেদের অবস্থান নিয়ে প্রকাশ্যে বা নেপথ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। আরিফ সোহেলের পদত্যাগ এবং ‘গণবিপ্লবী উদ্যোগ’ নামে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠন সেই সংকটকে আরও দৃশ্যমান করেছে।রাজনৈতিক দলের ভেতরে মতবিরোধ থাকতেই পারে। কিন্তু দলটি যদি প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যেই বারবার নেতৃত্বের সংকট ও বিভাজনের মুখে পড়ে, তাহলে তার সাংগঠনিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠাই স্বাভাবিক।

সাম্প্রতিক সময়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। জুলাই মাসে সিলেটে তাঁর গাড়িতে হামলার অভিযোগ উঠেছিল। এনসিপি তখন হামলার অভিযোগ করলেও পুলিশ তা অস্বীকার করেছিল।

এরপর ৪ অক্টোবর কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালন শাহের আখড়াবাড়িতে আরও গুরুতর ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, পাটওয়ারীকে লক্ষ্য করে ডিম, ইট ও পাথর নিক্ষেপ করা হয় এবং তাঁর গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। পরে পুলিশ তাঁকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়।

ঘটনার দায় নিয়ে অবশ্য রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। এনসিপির পক্ষ থেকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের দায়ী করা হয়েছে, অন্যদিকে ছাত্রদল তা অস্বীকার করেছে। কিন্তু যে প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, সেটি হলো, কেন এনসিপির নেতাদের বিভিন্ন জায়গায় এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে? এর আগে সারজিস আলম আখতার হোসেন ও বিভিন্ন সময় আক্রান্ত হয়েছেন। আর হাসনাত আব্দুল্লাহর লন্ডন সফর তো ইতিহাস হয়ে আছে।

একজন রাজনৈতিক নেতার গাড়ি ভাঙচুর বা তাঁর ওপর হামলা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক চিত্র হতে পারে না। যে দলই এর সঙ্গে জড়িত থাকুক, এর নিন্দা হওয়া উচিত। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও ভাবতে হবে, এনসিপির নেতাদের মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে তাদের কর্মসূচি ও সফরকে ঘিরে বারবার উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে?মাঠে কোনো নেতাকে ঘিরে প্রকাশ্য ক্ষোভ, বিক্ষোভ কিংবা প্রতিরোধ তৈরি হলে সেটিকে রাজনৈতিক সতর্কবার্তা হিসেবে নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে সেই নেতা যদি একটি নতুন রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় মুখ হন।

যে প্রশ্নগুলো আসে, মানুষ কেন তাদের ওপর বিরক্ত হচ্ছে?তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য ও বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে এত ফারাক কেন তৈরি হচ্ছে?কেন তাদের বিরুদ্ধে এত অভিযোগ?কেন তাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে?এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অন্যকে দোষ দিয়ে পাওয়া যাবে না। এন সিপির নিজেদের ভেতরেই খুঁজতে হবে।

এনসিপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, প্রভাব বিস্তার, অর্থনৈতিক অনিয়মসহ নানা অভিযোগও উঠছে। এসব অভিযোগের প্রতিটি সত্য, এমন কথা বলার আগে প্রমাণ প্রয়োজন। কিন্তু একটি নতুন দলের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ বারবার উঠলে দলটির নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো সেগুলোর স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়া।

বিশেষ করে অর্থের প্রশ্নে।দলের টাকা কোথা থেকে আসছে? নির্বাচনী কর্মকাণ্ডের অর্থের উৎস কী? কারা অর্থ দিচ্ছে? দলের নেতারা কীভাবে অর্থ সংগ্রহ করছেন? এসব প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ্যে দেওয়া দরকার। জামায়াতের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়ার যে অভিযোগ রাজনৈতিক অঙ্গনে উঠেছে, সেটিও পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত।কারণ নতুন রাজনীতি শুধু নতুন মুখ দিয়ে হয় না। নতুন রাজনীতি মানে নতুন রাজনৈতিক আচরণও।

এনসিপির মূল রাজনৈতিক সমস্যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও রাষ্ট্রের জন্ম ইতিহাস নিয়ে তাদের অবস্থান। কোনো রাজনৈতিক নেতাই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সমালোচনা আর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এক বিষয় নয়।

বাংলাদেশের জন্ম ১৯৭১ সালে। মুক্তিযুদ্ধ এই রাষ্ট্রের অস্তিত্বের ভিত্তি। তাই নতুন বাংলাদেশ নিয়ে যত কথাই বলা হোক, সেই বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসকে পাশ কাটিয়ে নতুন রাষ্ট্রচিন্তা দাঁড় করানো যায় না।

এনসিপির কিছু বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থানকে ঘিরে তাই যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তার জবাব তাদেরই দিতে হবে। তারা কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে নতুন রাজনীতি করতে চায়, নাকি ইতিহাসকে নতুন করে ব্যাখ্যা করার নামে এমন এক রাজনৈতিক অবস্থানে যেতে চায়, যা শেষ পর্যন্ত তাদের জনগণের বড় অংশের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে?

বাংলাদেশের মানুষ রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হতে পারে, দল নিয়ে বিভক্ত হতে পারে, কিন্তু ১৯৭১-এর প্রশ্নটি এ দেশের জাতীয় স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।এনসিপির সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল তরুণ নেতৃত্ব। এই তরুণরাই জুলাইয়ের আন্দোলনে মানুষের সামনে নতুন স্বপ্ন দেখিয়েছিল। তাই তাদের কাছ থেকে মানুষের প্রত্যাশাও ছিল বেশি। কিন্তু এখন সেই তরুণ নেতৃত্বের একটি অংশ যদি ক্ষমতার রাজনীতি, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, বিতর্কিত রাজনৈতিক সমঝোতা এবং নানা অভিযোগের মধ্যে আটকে যায়, তাহলে হতাশা তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক।

তারা কি সত্যিই নতুন রাজনৈতিক দল? নাকি পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে জায়গা করে নেওয়ার জন্য নতুন মুখের একটি প্ল্যাটফর্ম?এই প্রশ্নের উত্তর যতদিন তারা দিতে পারবে না, ততদিন তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাবে।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে ঘিরে কুষ্টিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনা সেই সন্দেহকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। কারণ রাজনীতির শেষ বিচার হয় মাঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা, বক্তৃতা, মিছিল কিংবা বড় বড় রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে দীর্ঘদিন জনগণের আস্থা ধরে রাখা যায় না। শেষ পর্যন্ত মানুষ দেখবে, কে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, কে তাদের কথা বলেছে এবং কে ক্ষমতার কাছে গিয়ে নিজের অবস্থান বদলে ফেলেছে।কিন্তু যদি তারা মনে করে, শুধু ক্ষমতার সমীকরণ, রাজনৈতিক জোট আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা দিয়েই দীর্ঘদিন রাজনীতি করা যাবে, তাহলে তারা ভুল করবে।কারণ বাংলাদেশের মানুষ খুব দ্রুত কাউকে মাথায় তোলে, আবার তার চেয়েও দ্রুত নামিয়েও দিতে পারে।

এনসিপির ভবিষ্যৎ তাই এখন তাদের নিজেদের হাতেই। তারা কি আন্দোলনের সন্তান হিসেবে নিজেদের পরিচয় ধরে রাখবে, নাকি ক্ষমতার রাজনীতির আরেকটি সাধারণ দল হয়ে যাবে?সময়ই সেই উত্তর দেবে।

তবে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় যে ক্ষোভ, বিক্ষোভ ও সংঘাতের ছবি সামনে আসছে, সেটিকে এনসিপির জন্য অন্তত একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত। এটি যদি তারা বুঝতে ব্যর্থ হয়, তাহলে যে দল একসময় নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেই দলই হয়তো খুব অল্প সময়ের মধ্যে মানুষের কাছে পুরোনো রাজনীতির আরেকটি হতাশার নাম হয়ে যাবে।