কূটনৈতিক প্রতিবেদক, ব্রিকলেন নিউজ, ঢাকা:
গ্রেপ্তার কিংবা প্রাণনাশের চরম ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার বিষয়ে অনড় অবস্থান ব্যক্ত করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।
আজ ১০ সেপ্টেম্বর আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত অগ্নি রায়কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা, তাঁর দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এবং বিএনপি-জামায়াত সমীকরণ নিয়ে বিস্তারিত মতামত তুলে ধরেছেন।
ঝুঁকি জেনেও দেশে ফেরার ঘোষণা
বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখলেই গ্রেপ্তার কিংবা চরম পরিণতির আশঙ্কা রয়েছে—এমন বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলে শেখ হাসিনা জানান, তিনি সব ধরনের ঝুঁকি জেনেই দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিমানে বা সড়কপথে যেভাবে ফিরুন না কেন, গ্রেপ্তার বা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার ঝুঁকিকে তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তাঁর ভাষ্যমতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ও শোচনীয় অবস্থা দেখেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করে জনগণের পাশে দাঁড়ানোকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা
গ্রেপ্তার হলে দল পরিচালনার বিষয়ে তিনি আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক কাঠামোর ওপর আস্থা প্রকাশ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, দলের সভাপতি অনুপস্থিত থাকলে পরবর্তী নেতৃত্ব দল পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন—এটি কোনো নতুন নিয়ম নয়, বরং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময় থেকেই চলে আসছে। তিনি ১৯৫৮ সালের সামরিক আইন জারি, ১৯৬৪ সালে দলের পুনরুজ্জীবন এবং ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনের পর বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তারের স্মৃতি উল্লেখ করে বলেন, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এমন পরিস্থিতিতে দল পরিচালনা করার সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে এবং সেই সাংগঠনিক ধারাবাহিকতাই বজায় থাকবে।
কূটনৈতিক বিতর্ক ও ভারত সফর
গত ৫ আগস্টের তাঁর সংবাদ সম্মেলনের জেরে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, সেটিকে ‘হাস্যকর অজুহাত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন শেখ হাসিনা। এ প্রসঙ্গে তিনি ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থার পটভূমি উল্লেখ করে দাবি করেন, ওই সময় তারেক রহমান রাজনীতি না করার মুচলেকা দিয়ে লন্ডনে যান এবং দীর্ঘ ১৭ বছর সেখান থেকেই দল পরিচালনা করেন। শেখ হাসিনা উল্লেখ করেন, তাঁর সময়েও ব্রিটেনের সঙ্গে তৎকালীন সরকারের সুসম্পর্ক বজায় ছিল এবং সেখানে থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চললেও তা বন্ধের জন্য কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়নি।
বিচার প্রক্রিয়া ও জামায়াত প্রসঙ্গ
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন ও আইনি প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে দাবি করেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য বিশেষ আইন ও আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হলেও, পঁচাত্তরের হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছিল প্রচলিত সাধারণ আইনে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাঁকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার করা হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ তোলেন। একইসঙ্গে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে একই রাজনৈতিক মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি দল দুটির মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই বলে মন্তব্য করেন।
প্রসঙ্গত, ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই বক্তব্য দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রার মেরুকরণ ও উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। একদিকে তাঁর প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙা করার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে এর তীব্র আইনি ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই বক্তব্য আগামী দিনগুলোতে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে কতটা প্রভাব ফেলে, তা-ই এখন আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষকদের মূল নজরে।